Friday 25 September 2026,

২৪ ঘণ্টায় ১৫ মৃত্যু, হাসপাতালে ৩১২৩ ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অকার্যকর ৮ উদ্যোগ

প্রকাশিত : 09:27 AM, 27 September 2023 Wednesday 217 বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

ডেঙ্গু ভাইরাসের জীবাণুবাহী এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। মশা নিধনে শত কোটি টাকা খরচ করা হলেও ফলাফল খুবই হতাশাজনক। এ নিয়ে কোনো কৈফিয়তও নেই কারও। রাজধানীর দুই কোটির বেশি মানুষ এডিস মশার কাছে জিম্মি। প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যু ও আক্রান্তের যে পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, তা সবার মাঝে ভয় জাগিয়ে দিচ্ছে। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের ডেঙ্গুর বুলেটিনে প্রকৃত তথ্য উঠে আসে না।

মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশন বাস্তবে কী করছে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেখা যেতে পারে। এডিসের লার্ভা নিধনে ড্রেনে গাপ্পি মাছ ছাড়া, জলাশয়ে নোভালোরুন ট্যাবলেট প্রয়োগ, জলাশয়ে হাঁস ও ডোবায় ব্যাঙ ছাড়া হয়। ড্রোন দিয়ে মশার উৎসস্থলও চিহ্নিত করা হয়। উড়ন্ত মশা মারতে ফগিং ও মশার লার্ভা নিধনে লার্ভি সাইডিং (স্প্রে) করা হচ্ছে। এ ছাড়া কারও বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানা করা হচ্ছে। এভাবে আট ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয় ডেঙ্গু নিধনে। কিন্তু তা বৈজ্ঞানিক উপায়ে না হওয়ায় এসব উদ্যোগেও মশা নিধন সম্ভব হচ্ছে না। অথচ, এর পেছনে বরাদ্দ থাকে বেশ ভালো পরিমাণ। চলতি অর্থবছরে শুধু মশা নিয়ন্ত্রণেই ১৬৮ কোটি টাকা বাজেট রাখা হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ এবং উত্তরের জন্য ১২১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এদিকে, উপরোক্ত আট উদ্যোগের বাইরেও সর্বশেষ উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সিঙ্গাপুর থেকে আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক ‘বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস’ (বিটিআই) আমদানি করে। বিটিআই নিয়েও বিতর্ক থাকায় সেটির প্রয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছে। এভাবে সব রকমের পদ্ধতি অনুসরণ করে মশা নিধনে অপরিকল্পিত চেষ্টা করায় দিন শেষে কার্যকর কোনো ফলাফল আসছে না। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ঢাকায় মশা নিধনের এমন হতাশাজনক চিত্রই পাওয়া গেছে।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৯৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিন হাজার ১২৩ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিন হাজার ১২৩ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৭৭৪ জন ও ঢাকার বাইরের দুই হাজার ৩৪৯ জন। ২৪ ঘণ্টায় যে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা পাঁচজন ও ঢাকার বাইরের ১০ জন। ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এক লাখ ৯৩ হাজার ৮৮১ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৮০ হাজার ৪৯০ জন। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ১৩ হাজার ৩৯১ জন।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, মশা মারতে ফগিং খুবই দুর্বল ও অকার্যকর একটি প্রক্রিয়া। কেননা এটি শুধু উড়ন্ত মশা মারতে ব্যবহার হয়। পরীক্ষার সময় ফগিংয়ের কার্যকারিতা শতকরা ৯০ ভাগের ওপর পাওয়া গেলেও খোলা জায়গায় তা সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ। বদ্ধ ও উন্মুক্ত স্থানে ফগিংয়ের কার্যকারিতার এত বেশি হেরফের হওয়ার কারণ, পরীক্ষার সময় ছোট বাক্স বা একটি নির্দিষ্ট স্থানে মশা আবদ্ধ করে ফগিং করা হয়। এতে মশা পালাতে পারে না, তাই তাদের গায়ে সরাসরি ওষুধ লেগে মারা যায়। কিন্তু খোলা জায়গায় ফগিং করতে গেলে প্রথমেই শব্দ শুনে মশা উড়ে যায়। সেই সঙ্গে খোলা বাতাসে ওষুধ দ্রবীভ‚ত হওয়ায় এর ঘনত্ব কমে কার্যকারিতা হারায়। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতার কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। এক্ষেত্রে মূল ভ‚মিকা রাখতে পারেন জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি মশক নিয়ন্ত্রণ কাজে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান এতটাই আতঙ্ক আর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমরা রীতিমতো দিশেহারা। প্রথমত, মশা নিধনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে উদাসীনতা এবং মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ বন্ধে জনসাধারণের তৎপরতার পরিবর্তে উদাসীনতা। দ্বিতীয়ত, বিশেষজ্ঞরা যে পরামর্শ দিচ্ছেন এডিস মশা তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, উপর্যুপরি কীটনাশক প্রয়োগে মশা জন্মানোর জন্য নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে কীটনাশক প্রয়োগে যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব প্রভৃতি কারণে মশার আচরণগত পরিবর্তন, বায়োরাসায়নিক পরিবর্তন ও শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন অনেক বেশি হয়েছে। ফলে প্রথাগত পদ্ধতিতে কীটনাশক প্রয়োগ তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। একই সঙ্গে গবেষক ও উন্নত গবেষণাগারের অভাবে সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির জুডিশিয়াল প্রয়োগ যথাযথ হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণাধীন ভবনে মশার উৎপত্তিস্থল পাওয়া গেলে জরিমানাও করা হয়। ব্যাপকভাবে পরিচালনা করা হয় মশক নিধন অভিযান। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারও মশার লার্ভা নিধনে দীর্ঘদিন ধরে ভোরে লার্ভিসাইডিং ও সন্ধ্যার আগে পূর্ণ বয়স্ক মশা মারতে ফগিং করে আসছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু এ পদ্ধতিতে কখনও সফলতা আসেনি।

এদিকে রাজধানীর নির্মাণাধীন স্থাপনাগুলোকে মশার বংশবিস্তারের আধার বলা হলেও তা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নেই বললেই চলে। নাগরিকদের অভিযোগ -এক্ষেত্রে রাজউক, গণপূর্ত, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ,

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ওয়াসার মতো সেবা সংস্থাগুলোর তেমন তৎপরতা চোখে পড়ে না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি মেম্বার কীটতত্ত¡বিদ জিএম সাইফুর রহমান বলেন, অক্টোবরে মশা যদি একটু কমে যায়, তাহলে সিটি করপোরেশন বলবে মশা নিয়ন্ত্রণ হয়ে গেছে। এতে মশা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কীটতত্ত¡বিদদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

তিনি বলেন, বিষয়টি একটি বিভাগের অধীনে থাকলে সেটি সারা বছর জবাবদিহির আওতায় থাকে। তারাই তখন দেখবে ক্লাস্টারগুলোর অবস্থা কী, সেগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায়। তারা ভাইরাস গবেষণাও করবে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2026 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT