প্রযুক্তির উৎকর্ষের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামে। কিশোর থেকে বয়স জ্যেষ্ঠ সবার হাতে স্মার্টফোন। সামাজিক বন্ধনের মিলনস্থল হিসেবে যে গ্রামকে আমরা জানি; গত কয়েক বছরে সেই গ্রাম আমূল বদলে গেছে। যে যার মতো মোবাইল হাতে ব্যস্ত। বিশেষ করে কোভিড মহামারী আসার পর এই আসক্তি আরও বেড়ে গেছে; যা সত্যিই ভয়াবহ।
আর এ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে ভারতের মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলার ভারগাঁও গ্রামের ৩ হাজার গ্রামবাসী নিজেদের মধ্যে নতুন নিয়ম চালু করেছে। আর তা হলো ডিজিটাল ডেট অফ।
সন্ধ্যা নামলেই ওই বেজে ওঠে সাইরেন। আর সাইরেন শব্দে একে একে বন্ধ হয়ে যায় গ্রামের সমস্ত মোবাইল ও টেলিভিশন। দেড় ঘণ্টার জন্য অফলাইনে চলে যায় পুরো গ্রাম। পরবর্তী সাইরেন না বেজে ওঠা পর্যন্ত গ্রামের কেউ মোবাইল ব্যবহার করে না। স্ক্রিন আসক্তি কমাতে এমনি অদ্ভুত এক নিয়ম চালু করেছে ভারতের প্রত্যন্ত ওই গ্রামটি।
সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হয় এই ডিজিটাল ডেট অফ এবং শেষ হয় রাত সাড়ে ৮টায়। এই সময়টাতে গ্রামের বাচ্চাদের পড়াশোনা এবং গ্রামবাসীদের একে অপরের সঙ্গে মৌখিক কথোপকথনের মতো অসামাজিক কার্যকলাপে উৎসাহিত করা হয়।
ভারগাঁও গ্রামের কাউন্সিলর বিজয় মহিত এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, এ বছর ভারতের স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন গ্রামের সবাই আলোচনায় বসে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরের দিন থেকেই এই নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে।
কিন্তু কেন নেওয়া হলো এই সিদ্ধান্ত। এ প্রসঙ্গে বিজয় মহিত জানান, করোনা মহামারির লকডাউন শুরু হওয়ার পরে বাচ্চারা অতিমাত্রায় মোবাইল ফোন আসক্ত হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে মহামারীর সময় বাধ্যতামূলক অনলাইন ক্লাস চালু হওয়ার পর থেকেই এই সমস্যা বাড়ছিল। অনলাইন ক্লাস শেষ হওয়ার পরেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনে মগ্ন থাকতো।
এমনকি নিয়মিত অফলাইন ক্লাস শুরু হলেও দেখা গেল বাচ্চাদের বেশিরভাগই ক্লাসে অমনোযোগী। এখানেই শেষ নয় স্ক্রিনে শক্তির প্রভাব পড়েছিল বড়দের মধ্যেও। দেখা গেল বড়রাও নিজেদের মধ্যে কথা বলা এবং পরিবারকে সময় দেওয়ার পরিবর্তে মোবাইলের পেছনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে।
এমন পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য গ্রামের সবাই মিলে কাউন্সিলর এর কাছে গেল। গ্রাম্য কাউন্সিলরের পক্ষে ডিজিটাল দুনিয়ার অন্যতম এই আসক্তি থেকে সবাইকে দূরে রাখার কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। কাউন্সিলর তখন গ্রামের সবাইকে বিশেষ করে নারীদেরকে ডেকে আনেন এবং তাদের মতামত জানতে চান। নারীরা অকপটে স্বীকার করেন- টিভি সিরিয়াল দেখা ও মোবাইলের পিছনে তাদের অনেক সময় ব্যয় হয়ে যায়। গ্রামের নারীরা সবাই চান যেন পুরো গ্রামে কয়েক ঘণ্টার জন্য টিভি এবং মোবাইল বন্ধ রাখার নিয়ম করা হয়।
এরপর আরেকটি সভায় সিদ্ধান্ত হয়- গ্রামের মন্দিরের ওপর সাইরেন লাগানো হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে তা বাজানো হবে। তারপর থেকে নিয়ম মেনে দেড় ঘণ্টার জন্য অফলাইনে চলে যায় পুরো এই গ্রামটি। অন্তত কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ডিজিটাল দুনিয়ার মোহ কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনকে উপভোগ করতে পারে তারা।
প্রকাশক মোঃ সোহেল রানা ও সম্পাদক: মোঃ মোজাম্মেল হক। ২৭, কমরেড রওসন আলী রোড, বজলুর মোড়, কুষ্টিয়া-৭০০০।
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | Design and Developed by- DONET IT