শুক্রবার ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

১৯ হাজার কোটি টাকা বকেয়া এলসি

প্রকাশিত : ০৭:৫১ পূর্বাহ্ণ, ২০ নভেম্বর ২০২১ শনিবার ২০ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

ব্যবসা-বাণিজ্যে করোনার নেতিবাচক প্রভাবে গত দেড় বছরে বকেয়া এলসি বেড়েছে প্রায় ২২০ কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির থাকায় এসব এলসির দেনা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার অভাবে এসব দেনা পরিশোধ কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থগিত করেছিল। এখন এলসির দেনা শোধ করতে হচ্ছে। নিয়মিত এলসির পাশাপাশি বকেয়া দেনা শোধ করায় রিজার্ভে চাপ বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে আরও দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে বকেয়া এলসির মধ্যে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে যেসব এলসি খোলা হয়েছিল, এর মধ্যে দেনা স্থগিতের পরিমাণ ১২৫ কোটি ডলার। বৈদেশিক ব্যাক টু ব্যাক এলসি ৯৪ কোটি ডলার।

করোনার কারণে এসব এলসির দেনা পরিশোধের মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়িয়ে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেগুলো গত অক্টোবর থেকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরে বৈদেশিক ব্যাক টু ব্যাক এলসির কোনো দেনা অপরিশোধিত ছিল না। ওইগুলো নিয়মিত পরিশোধ করা হয়েছে।

বৈদেশিক ঋণ নিয়ে খোলা এলসির বিপরীতে স্থগিত দেনা ছিল ৩১ কোটি ডলার। এর পরিমাণ চলতি অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৪ গুণের বেশি। করোনার আগে কখনোই বৈদেশিক ব্যাক টু ব্যাক এলসির দেনা বকেয়া থাকত না। যেটি গত অর্থবছরে বকেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে গত বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মতো বাংলাদেশেও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা ছিল। অক্টোবর থেকে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হলেও মন্দার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোক্তাদের নীতি সহায়তা দিতে এলসি পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়। গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন দফায় সময় বাড়ানো হয়।

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানে। এ কারণে এপ্রিল থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য ফের স্থবির হয়ে পড়ে। চলে আগস্ট পর্যন্ত। এ কারণে দুই দফায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এলসির দেনা পরিশোধ স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ বা বিদেশি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণে খোলা এলসির দেনা পরিশোধের মেয়াদ দুই দফা বাড়ানো হয়। এসব কারণে গত জুন পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণে খোলা এলসির দেনা পরিশোধ করতে হয়নি। এগুলো জুলাই থেকে সীমিত আকারে পরিশোধ শুরু হয়েছে।

বিদেশি ব্যাংকের ঋণের খোলা এলসিসহ অন্যান্য বকেয়া এলসিও একই সময়ে পরিশোধ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে অনেক এলসির মেয়াদ এখনো পূর্তি হয়নি। যেগুলোর মেয়াদ পূর্তি হচ্ছে, সেগুলো পরিশোধ করা হচ্ছে। আর যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়নি, সেগুলোর মেয়াদ পূর্ণ হলে পরিশোধ করা হবে। একসঙ্গে বেশি এলসির দেনা পরিশোধের কারণে এখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়েছে। যে কারণে ব্যাংকে ডলারের দাম বেড়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনার কারণে এলসির দেনা পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। সেগুলো এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে। একদিকে নতুন এলসি, অন্যদিকে আগের বকেয়া-দুটি একসঙ্গে হওয়ায় দেনার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতি আগে হয়নি। যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্কতার সঙ্গে এটি মোকাবিলা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের রিজার্ভ ভালো অবস্থায় রয়েছে। এ কারণে দেনা পরিশোধ করা হলেও এতে ভয়ের কিছু নেই। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। কেননা সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এটিকে বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বকেয়া এলসির পরিমাণ ছিল ১২৪ কোটি ডলার। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে এর পরিমাণ আরও ৯৬ কোটি ডলার বেড়ে হয়েছে ২২০ কোটি ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, সারা বিশ্বে এখন ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। করোনার আর কোনো ধাক্কা না এলে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হবে। তখন আর নতুন করে এলসির দেনা সমন্বয়ে বকেয়া পড়বে না। বকেয়ার অঙ্ক এখন ধীরে ধীরে কমে আসবে।

উদ্যোক্তারা এখন যেসব এলসি খুলেছেন, সেগুলোর বিপরীতে আর মেয়াদ বাড়ানোর সুবিধা পাবেন না। ফলে এগুলোর দেনা সমন্বয় হয়ে যাবে। নতুন করে বকেয়ার পরিমাণ আর না বাড়লে চলতি অর্থবছরের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ হয়ে যাবে।

সাধারণত তিন থেকে চার মাস মেয়াদে এলসি খোলা হয়। বৈদেশিক ঋণে খোলা হলে এর মেয়াদ ছয় মাস হয়। কিন্তু করোনার কারণে এর মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়তি মেয়াদ পাবেন উদ্যোক্তারা। ফলে আগামী মার্চের মধ্যে দেনা পরিশোধ সমন্বয় হয়ে যাবে বলে আশা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর পরে শুধু বৈদেশিক ঋণের কিছু এলসির বকেয়া থাকতে পারে। বৈদেশিক ব্যাক টু ব্যাক এলসির কোনো বকেয়া থাকবে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিয়ে খোলা ব্যাক টু ব্যাক এলসির (রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য খোলা এলসি) দেনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪ কোটি ডলার। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ খাতে কোনো এলসি বকেয়া ছিল না। স্থগিত এলসির দেনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫ কোটি ডলার।

গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৩৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ২০১৮ সালে ছিল ৩৯ কোটি ডলার, ২০১৭ সালে ছিল ৪৫ কোটি ডলার। গত কয়েক বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে স্থগিত এলসির দেনা। এগুলো এখন পরিশোধ করা হচ্ছে।

বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের নীতিমালা অনুযায়ী, এলসি খোলার সময় ক্রেতা-বিক্রেতার পক্ষে ব্যাংকের মধ্যে চুক্তি হয়। এতে এলসির দেনা কীভাবে পরিশোধ করা হবে, তার শর্ত উল্লেখ থাকে। তবে নীতিমালা অনুযায়ী তা তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। তা না করলে পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে উদ্যোক্তা খেলাপি হয়ে পড়বেন। তখন আর নতুন এলসি খুলতে পারবেন না।

এ কারণে এলসির দেনা শোধে কেউ সাধারণত পিছিয়ে থাকেন না। আর কোনো কারণে উদ্যোক্তা পরিশোধ করতে না পারলেও ব্যাংক ফোর্স লোন সৃষ্টি করে এলসির দেনা শোধ করে দেয়। এ কারণে আগে বকেয়া এলসি খুবই কম ছিল। যেগুলো বকেয়া থাকত, সেগুলোও ছয় থেকে এক বছরের মধ্যে বেশির ভাগই মিটে যেত।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT