শুক্রবার ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

হঠাৎ আগের চেহারায় ঢাকা

প্রকাশিত : ১২:০৯ অপরাহ্ণ, ৬ মে ২০২০ বুধবার ৮৮ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

সারাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। মোট রোগীর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর প্রায় ৫৮ ভাগ। আর ঢাকা বিভাগে ৮৩ ভাগের বেশি। প্রতিদিন বাড়ছে রেকর্ড আক্রান্ত। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার এক স্বাভাবিক ঢাকা শহর দেখল দেশসহ গোটা বিশ্বের মানুষ। হ্যাঁ। তাই সত্যি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপকতা বাড়ার মধ্যে সাধারণ ছুটির ৩৯তম দিনে এসে স্বরূপে ফিরতে শুরু করছে চিরচেনা রাজধানী ! শুধুমাত্র গণপরিবহন ছাড়া সবধরনের গাড়ি সড়কে চলাচল করছে। কোথাও কোথাও হয়েছে যানজট। বিভিন্ন মহাসড়ক ফেরিঘাটে যানজটের খবর পাওয়া গেছে।

সোমবার সরকারের পক্ষ থেকে আগামী ১ মে থেকে দোকানপাট-মার্কেটসহ শপিংমল খোলার ঘোষণা

আসে। পরদিন সকাল থেকে সবকিছু যেন এমনি এমনি স্বাভাবিক হয়ে যায়। এর আগে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপরই সাভারসহ বিভিন্ন স্থানে গার্মেন্টস কর্মীরা করোনায় আক্রান্ত হন। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে রাজধানীতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। সবকিছু চলছে ঢিলেঢালা। রাস্তায় পুলিশ, র‌্যাবসহ সেনা সদস্যদের টহল একেবারেই কমেছে।

এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনায় শনাক্তের সংখ্যা যখন উর্ধমুখী তখন সবকিছু শিথিল করার চিন্তা বিপদ বাড়াতে পারে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে করোনা আক্রান্তের হার কমতে শুরু করলে মার্কেট-শপিংমল খোলাসহ অন্যান্য সবকিছু শিথিলের পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, আমাদের মনে রাখা উচিত যেসব দেশে লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে সেসব দেশ অনেক আগে আক্রান্ত হয়ে এখন কমতির দিকে। আমাদের দেশে জনসংখ্যা ঘনত্ব অনেক বেশি। তাছাড়া অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের আক্রান্ত হওয়ার সময় অনেক পরে। তাই এখনই সময় আসেনি শিথিল পরিস্থিতির দিকে যাওয়ার।

তারা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনা শনাক্ত যখন বাড়ছিল ঠিক তখন লকডাউন শিথিল করা হয়। তখন মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়। এর বাইরেও বিশ্বের অন্যান্য দেশকে শিথিলের মতো ভুল পথে হেটে বড় রকমের মাশুল গুণতে হয়েছে।

মঙ্গলবার দেশে সর্বোচ্চ সংখ্যাক ৭৮৬ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আগেরদিন ছিল ৬৮৮ জন। যখন দেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন তখন লকডাউন শিথিল করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হবে এমন প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডাঃ কামরুল হাসান খান বলেন, সাধারণত যখন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে সেই সময়ে কোন কিছু শিথিল করা ঠিক নয়।

তিনি বলেন, সরকার অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে গার্মেন্টস বা যে কোন সেক্টর যদি পুরোদমে সচল করা হয় তাহলে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার বিকল্প নেই। সবাইকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। তা না হলে বড় রকমের সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়।

তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের কথা যদি বলি-সর্বোচ্চ মাত্রায় কোভিড-১৯ আক্রান্ত যখন বাড়ছিল তখন লকডাউন শিথিল করে অনেকে দেশে হিতে বিপরীত হয়েছে। এ বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তবে সবকিছু মিলে মনে হচ্ছে সরকারের করোনা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব আছে।

তিনি বলেন, আগে করোনা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এমনকিছু সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না যার ফলে সমস্যা আরও বাড়ে। তাই ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের।

যদি খিলগাঁও রেলগেট এলাকার কথা বলি তাহলে সবকিছু সেখানে স্বাভাবিক দেখা গেছে। বাজার জমজমাট। সড়কের পাশে বসেছে চায়ের দোকান। সারি সাড়ি রিক্সা থামানো আছে। ব্যক্তিগত যানবাহনের উপদ্রব তো আছেই। বেড়েছে পাল্লা দিয়ে যানবাহনের হর্নের মাত্রা। এ থেকেই বোঝা যায় গাড়ির সংখ্যা কতটা বেড়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, মার্চের আট তারিখ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে ফাঁকা হতে থাকে গোটা রাজধানী। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় সাধারণ ছুটি। বন্ধ হয় গণপরিবহন। সবাইকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। ২৬ মার্চের পর ঘোষণা ছাড়াই সকাল থেকে খিলগাঁও এলাকা পুরোপুরি জমজমাট হয়ে ওঠে।

মৌচাক এলাকায় খুলতে দেখা গেছে দোকানপাট। ফুটপাথে বসেছে কাপড়ের দোকান। ভ্যান দিয়ে কাপড় বিক্রি করতে দেখা গেছে মালিবাগ মোড়ে। ব্যবসায়ীরা এক সাটার খোলে পুরোদমে দোকান চালুর প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে। একই রকম চিত্র দেখা গেছে গুলিস্তান ও পল্টন এলাকাতেও।

শাজাহানপুর মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ চোখে পড়েনি। কিন্তু গাড়ির চাপ অনেক বেশি। সিগন্যাল ছাড়াই চলছে সব ধরনের যানবাহন। তবে প্রাইভেটকার, অটোরিক্সা ও রিক্সা সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। মগবাজার মোড়েও দেখা গেছে যানবাহনের চাপ বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

কাকরাইল, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, পল্টন, শান্তিনগর, বেইলী রোড, মগবাজার, মালিবাগ, মৌচাক, বাংলামোটর, ইস্কাটন, শাহবাগ, ফার্মগেট, কাওরানবাজার, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে অবাধে যানবাহন চলছে। চালকসহ ব্যক্তিগত এসব যানের যাত্রীরা বলছেন, গত এক সপ্তাহ ধরেই গাড়ি দিয়ে চলাচলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন বাধা আসছে না। মূলত এখন আগের মতো রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল নেই। তাই নজরদারি কমে যাওয়ায় জবাবদিহিতাও কমেছে। এই সুযোগে যান চলাচল বেড়েছে।

কারও কারও প্রশ্ন একদিকে সাধারণ ছুটি বাড়ানো হয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ থাকবে ছুটি বাড়ানো সময় পর্যন্ত। তবে দোকানপাট, শপিংমল কেন খুলে দেয়া হচ্ছে। ১০ মে থেকে মার্কেট ও শপিংমল খোলা হলে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা কঠিন হবে। কোনভাবেই স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে ঢাকা শহরজুড়ে এখন মানুষ আর যানবাহনের ঢল। কোন রকম বাধা ছাড়াই সবকিছু স্বাভাবিক হতে চলেছে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে সরকারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। যা দ্রুত সময়ে দূর করা সম্ভব।

এদিকে মঙ্গলবার সকালের পর রামপুরা, বিশ্বরোড, আব্দুল্লাহপুর, আমিনবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় যানবাহনের চাপে যানজট দেখা যায়। রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে এখন আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদাড়ি নেই। ইচ্ছেমতো রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হচ্ছেন সবাই। এতে করোনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে এক সপ্তাহ আগেও খুবই কড়াকড়ি দেখা গেছে।

অপরদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক থেকে ঢাকার প্রবেশপথে যানজট লক্ষ্য করা গেছে। সড়কগুলোতে ট্রাক ও লরি ছাড়াও লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য দেখা গেছে। বলা যায় দূরপাল্লার বাস ছাড়া সব ধরনের যানবাহনই সড়কে চলাচল করছে। সকালে রাজধানীর বনানী, বিজয় সরণি, যাত্রাবাড়ী, আব্দুল্লাহপুর ও গাবতলী এলাকায় সিগন্যাল অপেক্ষা করতে দেখা গেছে গাড়িগুলোকে। ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজি অটোরিক্সাসহ বেড়েছে রাজধানীর সড়কে। বিভিন্ন এলাকায় মানুষের ভিড়ও দেখা গেছে। অনেককেই আবার হেঁটে কর্মস্থলে যেতে দেখা গেছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের মদনপুর এলাকায় দেখা যায়, মহাসড়কে প্রচুর গাড়ি। দূরপাল্লার বাস ছাড়া সব ধরনের গাড়ি রয়েছে মহাসড়কে। হাইওয়ে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খেতে দেখা গেছে। এছাড়াও সিএনজির স্ট্যান্ডগুলোতে সিএনজি নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে চালককে। একই চিত্র দেখা গেছে গাবতলী ও আব্দুল্লাহপুর দিয়ে ঢাকার প্রবেশপথে।

সিএনজি অটোরিকশাচালক সাদেক মিয়া জানান, পেটের তাগিদে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছি। তবে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি যাত্রী মিলছে। কয়দিন আগেও খুব ভয় ও আতঙ্ক ছিল মানুষের মাঝে, এখন আর সেটা নেই। পুরোদমে আমরা গাড়ি চালাচ্ছি। কোন বাধা নেই।

এ্যাপভিত্তিক যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও মঙ্গলবার মোটরসাইকেল ও ভাড়ায় প্রাইভেটকার চলতে দেখা গেছে। প্রাইভেটকার চালক মোহন জানান, রাস্তায় যাত্রী বেড়েছে। এ্যাপ সেবা বন্ধ থাকলেও চুক্তিতে ভাড়া মিলছে। সড়কে চলাচলে কোন সমস্যা হচ্ছে না। একই কথা জানালেন, বাইক চালক সুমন ও তারা মিয়া। তারা জানান, এক মাসের বেশি সময় বেকার। সহায় সম্বল সব শেষ। হাত পাতার জায়গা নেই। তাই পেট চালাতে রাস্তায় নেমেছে। ভাড়াও মিলছে বেশ।

ব্যক্তিগত গাড়িচালক ফুল মিয়া বলেন, সকালে বনানী সিগন্যালে যানজট ছিল। প্রায় ৫ থেকে ৭ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে সিগন্যালে। মদনপুরে হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান, আগের মতোই ব্যস্ততা বেড়েছে সড়কে। মঙ্গলবার মহাসড়ক অনেকটা স্বাভাবিক।

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) বলেন, লকডাউন শিথিল করাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশকিছু গাইডলাইন দিয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হলো রোগীর সংখ্যা কমতে থাকা ও টেস্ট বাড়ানোসহ হট স্পট নির্ধারণ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT