শনিবার ২৫ মে ২০২৪, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সমুদ্রসৈকত দখল করে প্লট বাণিজ্য

প্রকাশিত : ০৯:৩১ পূর্বাহ্ণ, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪ বৃহস্পতিবার ২০ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়া এলাকায় প্রতিযোগিতা করে সমুদ্রসৈকত দখলে নেমেছে একটি প্রভাবশালী চক্র। দখলের পর তা প্লট বানিয়ে স্ট্যাম্পে লিখে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। শুধু সমিতিপাড়া এলাকায় হাজার হাজার একর সৈকতের ভূমি দখল করে সেখানে শত শত বসতি গড়ে তুলেছে চক্রটি। যেসব জমির দাম কোটি কোটি টাকা। দখলবাজদের কেউ কেউ নিজের নামে পাড়ার নামকরণ করে বসতি গড়ে তুলেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজার পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে ভূমিদস্যু চক্রটি গড়ে উঠেছে। নাম শোনা যাচ্ছে একজন প্রভাবশালী সচিবসহ কয়েকজন আইনজীবীরও। স্থানীয় প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় তারা সমুদ্রসৈকত দখল করে ঝাউবন কেটে প্লট বানিয়ে বিক্রি করছেন দীর্ঘদিন ধরে। অনেকে দাবি করেছেন, অন্যের কাছ থেকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জায়গার দখল কিনে তারাও স্ট্যাম্প করে বিক্রি করছেন।

এদিকে এসব দেখেও না দেখার ভান করছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। ফলে আরও বেপরোয়া হয়ে সমুদ্র দখলে নেমেছে দখলবাজ চক্রটি।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ঝড় রোধে অসম্ভব ক্ষমতার জন্য সমুদ্রসৈকতে ঝাউগাছ লাগানো হয়। ঝাউগাছ ঝড়ের গতিকে প্রতিরোধ করার অস্বাভাবিক ক্ষমতা রাখে। জলোচ্ছ্বাসের সময় এ গাছ মানুষের আশ্রয় হিসাবেও কাজ করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের সমুদ্রসৈকতের ঝাউবন কেটে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বানানো হয়েছে কয়েকশ একর প্লট। সেই প্লট করায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে ভূমিহীন, রোহিঙ্গা ও বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদের কাছে। সেখানে তারা নির্মাণ করেছে শতাধিক ঘরবাড়ি। কয়েকটি স্থানের ঝাউবন ধ্বংস করে পুকুর বানিয়ে করা হয়েছে মাছের চাষ। প্রভাবশালীরা সমুদ্রসৈকতে কয়েকটি এলাকার নামকরণ করেছেন তাদের নিজেদের নামে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে ভূমি অফিস ও বনবিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছেন। প্রভাবশালীরা এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘ম্যানেজ’ করে সৈকত দখল করে গ্রাম বানাচ্ছেন। যে কারণে প্রকাশ্যে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সমুদ্রসৈকত দখল করে বিক্রি করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে কয়েকটি স্থাপনা ভেঙে দিলেও জড়িত প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা বা দখলবাজির এই মহোৎসব বন্ধ হচ্ছে না বলে জানান স্থানীয়রা।

সরেজমিন দেখা যায়, কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি মো. এরশাদ দখল করেছেন ৫ একর সমুদ্রসৈকত। সেখানে ঝাউবন নিধন করে বানিয়েছেন একাধিক প্লট। সেখান থেকে মহেশখালীর মাতারবাড়ীর দুই নারীর কাছে ২৫ হাজার টাকা শতক দরে সাড়ে তিন লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন ১৪ গণ্ডা সৈকতের বালিয়াড়ি। সেখানে ঘর বানিয়ে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন ওই দুই নারী। এভাবে সৈকত দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এই যুবলীগ নেতা।

একই ওয়ার্ডের যুবলীগের সভাপতি মোস্তাক আহমদ ঝাউবাগান কেটে একাই দখল করেছেন সমুদ্রসৈকতের ২০ একর ভূমি। অর্ধশতাধিক প্লট বানিয়ে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। শুধু তার দখলীয় বালিয়াড়িতে ঘর বানিয়ে বসবাস করছে শতাধিক পরিবার। ওই এলাকার নামকরণও করা হয়েছে ‘মোস্তাকপাড়া’ নামে। এখানে শেষ নয়, একজন অ্যাডভোকেট ও সচিবসহ কয়েকজনের সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করেছেন কয়েক একর জায়গা। ওই জায়গাতে সাগর পর্যন্ত ঝাউবাগান কেটে লাগানো হয়েছে আকাশমনি ও নারকেল গাছের চারা। চারপাশে কাটাতরের বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবুল কাশেম ওরফে বাসিন্না দখল করেছেন কয়েক একর সমুদ্রসৈকত। তিনিও ঝাউবাগান কেটে প্লট বানিয়ে বিক্রি করেছেন কয়েক একর বালিয়াড়ি। এই বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা গ্রামের নামকরণ হয়েছে ‘বাসিন্নাপাড়া’।

একই ওয়ার্ডের শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ও জামায়াত নেতা পশ্চিম কুতুবদিয়া এলাকার আতাউর রহমান কাইছার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন আনুমানিক ১০ লাখ টাকা।

স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আজিজ রুবেলও সমুদ্রসৈকত দখল করে বিক্রি করেছেন কয়েক একর জায়গা। তিনি আনুমানিক ৫০ লাখ টাকার সৈকতের জমি বিক্রি করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একইভাবে ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামও সমুদ্রসৈকতের কয়েক কানি বালিয়াড়ি দখল করে ঘিরে রেখেছেন। সেখান থেকে বিক্রি করছেন বিভিন্নজনের কাছে।

ওয়ার্ড কুতুবদিয়াপাড়ার ছৈয়দ আলম নামের এক ব্যক্তিও কয়েক একর সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে ঘিরে রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে। সেখানে ঝাউবাগান কেটে পুকুর বানিয়ে মাছের প্রজেক্ট বানিয়েছেন তিনি।

বালিয়াড়ি দখলে পিছিয়ে নেই পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা আক্তার কামাল আজাদ। তিনিও সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে ঝাউবাগান কেটে ম্যালেরিয়া গাছের বাগান করে রেখেছেন কয়েক বছর ধরে। সেখান থেকে লিংক রোডের এক ব্যক্তির কাছে প্লট বানিয়ে ১ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। এছাড়া কয়েকশ একর খাস জমি তার দখলে রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

এদিকে ঝাউবাগান রক্ষার জন্য ৩০ জনের কমিটি করেছিল বনবিভাগ। অভিযোগ আছে, এই কমিটির বেশিরভাগ সদস্য সমুদ্রসৈকত রক্ষার ঝাউবাগানকে নিজের সম্পত্তি মনে করে প্লট বানিয়ে গণ্ডা হিসাবে চড়া দামে রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের কাছে বিক্রি করেছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, সমুদ্রসৈকতের সীমানা নির্ধারণ করার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছি। কিন্তু সৈকত রক্ষার জন্য আজ পর্যন্ত কোনো কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করা হয়নি। যার কারণে ঝাউবাগান কাটা হলেও ব্যবস্থা নেয় না প্রশাসন। এভাবে নির্বিচারে ঝাউবন কেটে প্লট বানিয়ে বিক্রি করার ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ঝাউবন রক্ষায় বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।

দখলে জড়িতদের বক্তব্য : স্থানীয় কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা আকতার কামালের কাছে সুমদ্র দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে এ বিষয়ে সামনাসামনি আলোচনা করে বিষয়টি শেষ করতে সুযোগ চেয়েছেন।

তবে দখলে জড়িত ১নং ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি মো. এরশাদ বলেন, তারাও বিভিন্নজনের কাছ থেকে সুমদ্রসৈকতের দখল কিনেছেন স্ট্যাম্পের মাধ্যমে। তাই তিনিও প্লট বানিয়ে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে দখল বিক্রি করছেন। তার দাবি সবাই একই কায়দায় দখল কেনাবেচা করছে। অভিযুক্তদের আরও কয়েকজন এরশাদের সুরে কথা বলেছেন।

জানতে চাইলে সৈকত দখল করে নিজের নামে পাড়া গড়ে তোলা স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মোস্তাক আহমেদ বলেন, অনেক আগে আমি এখানে এসে বসতি গড়েছি। তাই আমার নামে পাড়ার নামকরণ হয়েছে। তবে আমি এখন সৈকত দখল করে প্লট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নই। এক পর্যায়ে তিনি সাক্ষাতে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে চেয়ে নিউজে তার নাম না দেওয়ার অনুরোধ জানান।

জামায়াত নেতা আতাউর রহমান কাইছারের বক্তব্যের জন্য ফোনে ও অফিসে গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

যা বলছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন : কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল আমিন বলেন, ঝাউবাগান কেটে পরিবেশ বিধ্বংসী কোনো কাজ করা হলে সরেজমিন গিয়ে তদন্ত করে পরিবেশ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম বলেন, আমরা সরেজমিন গিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. শাহীন ইমরান বলেন, সমুদ্রসৈকতের ঝাউবন কেটে প্লট বানিয়ে বিক্রি করার কোনো নিয়ম নেই। কেউ যদি কেটে থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।



© ২০২৪ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT