শুক্রবার ১৮ জুন ২০২১, ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংকটে জাহাজ ভাঙা শিল্প

প্রকাশিত : ০৬:১৭ পূর্বাহ্ণ, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শনিবার ৩৮৮ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই শিল্পের চলার পথে নতুন ‘বাধা’ সরকার আরোপিত উচ্চ শুল্ক্ককর। এই উচ্চ শুল্ক্ককর মানতে চাইছেন না ইয়ার্ড মালিকরা। শুল্ক্ককর কমানোর দাবি জানিয়ে সফল না হওয়ায় এখন ইয়ার্ড থেকে একযোগে স্ট্ক্র্যাপ লোহা বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন শিপইয়ার্ড মালিকরা। এতে লোহা তৈরির কাঁচামাল সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের ৩০ হাজারের মতো শ্রমিক-কর্মচারী। মঙ্গলবার থেকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলো থেকে পুরনো জাহাজের স্ট্ক্র্যাপ বিক্রি বন্ধ রাখা হয়। ‘লোহার খনি’ খ্যাত ইয়ার্ডগুলো থেকে স্ট্ক্র্যাপ সরবরাহ বন্ধ রাখায় রি-রোলিং মিলগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বেড়ে যেতে পারে লোহার দাম।

ইয়ার্ড থেকে স্ট্ক্র্যাপ লোহা ডেলিভারি বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বর্তমানে প্রতিটি জাহাজে টনপ্রতি কাস্টম ডিউটি দেড় হাজার টাকা, অগ্রিম আয়কর পাঁচশ’, অগ্রিম কর দুই হাজার ও স্থানীয় ভ্যাট এক হাজার টাকা- সব মিলিয়ে প্রতি টন স্ট্ক্র্যাপ লোহায় পাঁচ হাজার টাকা সরকারকে দিতে হচ্ছে। আগে যা ছিল দুই হাজার তিনশ’ টাকা। এভাবে নানা খাতে কর বৃদ্ধির ফলে এই শিল্পে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে ইয়ার্ড মালিকরা অতিরিক্ত কর ছাড়ের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু কাজ না হওয়ায় স্ট্ক্র্যাপ লোহা বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।

বিএসবিআরএর সদস্য ও শীতলপুর স্টিল অ্যান্ড রি-রোলিং মিলের মালিক নাজিম উদ্দিন বলেন, লোহা তৈরির কাঁচামালের দাম বাড়ায় রি-রোলিং মিলগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অটো রি-রোলিং মিলে ৬০ গ্রেডের এক টন লোহা উৎপাদনে প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হলেও সেই লোহা বিক্রি করতে হচ্ছে ৫৫ থেকে ৫৬ হাজার টাকা। এভাবে লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন করে কর বৃদ্ধির কারণে ইয়ার্ড থেকে স্ট্ক্র্যাপ ডেলিভারি বন্ধ রাখা হয়েছে।

একই প্রসঙ্গে ম্যাক করপোরেশন শিপ ব্রেকার্স ও মাদার স্টিল অ্যান্ড রি-রোলিং মিলের মালিক আবুল কাশেম বলেন, পুরনো জাহাজের প্রতি টন স্ট্ক্র্যাপ লোহার পেছনে ইয়ার্ড মালিকদের খরচ গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। আর সেই স্ট্ক্র্যাপ ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। কর বাড়ায় ইয়ার্ড মালিকদের এই ক্ষতি আরও বেড়েছে। ইয়ার্ড মালিকরা নিরুপায় হয়ে বর্তমান অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ির লালবেগ শিপইয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ইয়ার্ডে তেমন প্রাণচাঞ্চল্য নেই। বাইরে কোনো স্ট্ক্র্যাপ লোহা ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে না। প্রায় অভিন্ন অবস্থা বিরাজ করছে অন্যান্য ইয়ার্ডেও। জানা যায়, সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং জোনে দেড়শ’ ইয়ার্ডের স্থাপনা থাকলেও কার্যক্রম চলছে ৫৫টিতে। শুল্ক্ককরের জটিলতা নিরসন না হলে ইয়ার্ডের সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্ট ইয়ার্ড মালিকরা।

বিএসবিআরএর সাবেক সহসভাপতি কামাল উদ্দিন বলেন, এমনিতেই জাহাজ ভাঙা শিল্পের অবস্থা ভালো নয়, তার ওপর সরকার বাজেটে যেভাবে স্ট্ক্র্যাপ লোহার ওপর স্থানীয় কর ও অগ্রিম কর বসিয়েছে তাতে এই শিল্প ধ্বংস হতে বেশি দিন লাগবে না। আগে মাসে গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত জাহাজ আসত ইয়ার্ডগুলোয়। সেখানে গত তিন মাসে ৫টি জাহাজও আসেনি। এর মধ্যে ঋণখেলাপি হয়ে অনেক শিপ ব্রেকিং ব্যবসায়ী দেশ ছেড়েছেন। নাজুক অবস্থার কারণে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।

স্ট্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে উৎপাদিত পণ্য অভ্যন্তরীণ শিল্পে ব্যবহারের দিক থেকে শীর্ষে বাংলাদেশ। দেশের আড়াইশ’ রি-রোলিং মিলের প্রধান কাঁচামালের জোগান আসে জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে। ফলে ইয়ার্ড থেকে কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ায় অচিরেই লোহার বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন ও তুরস্ক- বিশ্বের এই পাঁচটি দেশ স্ট্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করে। এর মধ্যে চীন ও তুরস্ক নামমাত্র হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চলে ভারত আর পাকিস্তানের। তাই শুল্ক্ককরের জটিলতা নিরসন না হলে বাজার হারানোর শঙ্কা করছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা।

আন্তর্জাতিক বাজারে লোহার দাম কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের অনেকে বিপুল লোকসানের মুখে পড়েছেন বলে দাবি করছেন সংশ্নিষ্ট ব্যবসায়ীরা। একেকটি জাহাজে ১০-২০ কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে তারা দাবি করছেন। অপরদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ট্ক্র্যাপ লোহার দাম কমে যাওয়ায় দেশি স্টিল মিল মালিকরা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড থেকে লোহা না কিনে সরাসরি বিদেশ থেকে স্ট্ক্র্যাপ আমদানি করছেন। এতে স্টিল মিল মালিকদের খরচ কম পড়ছে। কিন্তু শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তারা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য না থাকার মাঝে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে সরকারি শুল্ক্ককর।

সীতাকুণ্ডের আয়কর বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সরকার যেভাবে ট্যাক্স আরোপ করেছে তারা সেভাবে আদায় করছেন। ফলে ট্যাক্স ছাড় দেওয়ার সুযোগ তাদের নেই। অগ্রিম ট্যাক্সের বিষয়ে তিনি বলেন, এই ট্যাক্স পরে সমন্বয় করা হবে। কোনো ইয়ার্ড মালিকের যদি সমন্বয়ের পরও টাকা পাওনা থাকে তাহলে তা সরকার ফেরত দেবে।

অবশ্য একাধিক জাহাজ মালিক বলেছেন, অগ্রিম ট্যাক্স সমন্বয় করা হলেও পরে যদি তারা জাহাজ আমদানি করতে না পারেন তাহলে কীভাবে সমন্বয় করা হবে? সরকারের কোষাগারে টাকা চলে গেলে সেই টাকা ফেরত আনা কঠিন।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT