শনিবার ২৫ মে ২০২৪, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শিল্প-কারখানায় উৎপাদনে ধস

প্রকাশিত : ০৯:৩২ পূর্বাহ্ণ, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪ বৃহস্পতিবার ২১ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

সারা দেশে গ্যাসের তীব্র সংকটে শিল্প উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। গ্যাস সংকটে গাজীপুরের কোনাবাড়ি, কালিয়াকৈর, কাশিমপুর ও এর আশপাশের এলাকার বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। গত এক সপ্তাহ ধরে এই সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। শ্রমিকরা কারখানায় আসছেন ঠিকই কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে কাজ করতে পারছেন না। এতে কারখানা মালিকরা পড়েছেন মহাবিপদে। প্রতিদিন তাদের লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। গাজীপুর ও ফতুল্লায় কয়েকদিন ধরে গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমেছে। এতে পোশাক কারখানা, ডাইং কারখানা, স্পিনিং, টেক্সটাইল, রি-রোলিং মিলসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা না হলে রপ্তানি বাণিজ্যে মারাত্মক ধস নামার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া এতে দেশের অর্থনীতিও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

কারখানার মালিকরা বলছেন, বয়লার চালানোর জন্য প্রতি ঘনফুটে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ থাকা দরকার। কিন্তু অনেক কারখানায় চাপ কমে প্রতি ঘনফুটে ১ থেকে ২ পিএসআইতে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোথাও শূন্যে নেমেছে। তারা বলেন, একদিকে ডলার ক্রাইসিস অপরদিকে গ্যাস সংকট চলতে থাকলে এ সেক্টরে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।

পাশাপাশি গ্যাস সংকটে আবাসিক গ্রাহকরাও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে বাসা-বাড়িতে রান্নার কাজ হচ্ছে মাটির চুলায়, কোথাও সিলিন্ডার গ্যাসে। সুযোগ বুঝে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবসায়ীরাও দাম নিচ্ছেন যার যেমন খুশি। এতে ক্ষোভে ফুঁসছেন আবাসিক গ্রাহকরাও। সিএনজি পাম্পেও গ্যাস সংকট। লাইনে গ্যাস নেই। প্রায় প্রতি পাম্পেই প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের দীর্ঘ জট দেখা যাচ্ছে। বুধবার সরেজমিন বিভিন্ন কারাখানা ও আবাসিক এলাকা ঘুরে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্যাস সংকটের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের কাজ চলছে। তবে সম্প্রতি যে সংকট চলছে সেটি কিছুদিনের মধ্যে সমাধান হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা গ্যাস সরবরাহে দেশে দুটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) আছে। গত নভেম্বরে একটি ইউনিট সংস্কারের জন্য পাঠানো হয়। যে কারণে গ্যাসের সংকট বেড়েছে। সংস্কার শেষ হওয়ার দু-একদিনের মধ্যেই ইউনিটটি গ্যাস সরবরাহ শুরু করবে। কিন্তু একই সঙ্গে অন্য একটি এফএসআরইউ সংস্কার কাজের জন্য পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই ইউনিটটির সংস্কার কাজ চলবে। এরপর আগামী রমজান ও বোরো সেচ মৌসুমকে সামনে রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

দুটি ইউনিট চালু থাকলে প্রতিদিন প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। বর্তমানে একটি ইউনিট প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু হলেও গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে না। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

গাজীপুর ও কালিয়াকৈর : কোনাবাড়ী শিল্পাঞ্চল (বিসিক) এলাকায় বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে উঠেছে। এগুলোর অন্যতম উপাদান হচ্ছে প্রাকৃতিক জ্বালানি। অর্থাৎ গ্যাসের ওপর ভিত্তি করেই এসব এলাকায় শিল্প গড়ে ওঠে। এখন সেই গ্যাসেরই চলছে তীব্র সংকট। এ কারণে এসব এলাকার অনেক শিল্পকারখানা প্রায় বন্ধের জোগাড় হয়েছে। শিল্প মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এলাকার তৈরি পোশাক শিল্পগুলো বিদেশি কার্যাদেশ সময়মতো সরবরাহ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় আছে। লাইফ টেক্সটাইল (প্রাইভেট) লিমিটেড ও কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুরের ময়জউদ্দিন টেক্সটাইল লিমিটেডের পারসোনাল অফিসার (এমডি এসআইআর) এমডি হাসান বলেন, মাস ঘুরতেই শ্রমিকের বেতন-ভাতা গুনতে হয় ১০ থেকে ১১ কোটি টাকা। অথচ গ্যাস সংকটে ফ্যাক্টরি চার দিন ধরে বন্ধ। বিকল্প হিসাবে মাত্রাতিরিক্ত খরচে সিএনজি ও ডিজেলের মাধ্যমে ব্রয়লার ও জেনারেটর চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, গত এক-দেড় মাস ধরেই গ্যাস সংকটে কারখানা চলেছে ঢিমেতালে। যেখানে বয়লার চালাতে প্রয়োজন ১৯,৯৬০ ঘনফুট এবং জেনারেটর চালাতে লাগে ৯০০০ ঘনফুট গ্যাস সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে দেড় বা দুই পিএসআই। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সফিপুরের ময়জউদ্দিন টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিতে ৪ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এখানে দৈনিক বয়লার চালাতে ১৫ পিএসআই এবং জেনারেটর চালাতে লাগে ১০ পিএসআই, কিন্তু সেখানে গ্যাসের সরবরাহ জিরো (শূন্য)। আমরা ভেবেছিলাম নির্বাচনের পর হয়তো ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু না গ্যাসের সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত ৪ দিন কারখানা বন্ধ থাকার পর বায়ারের অর্ডার ডেলিভারির স্বার্থে আমরা কয়েকগুন বেশি খরচে (ডিজেল ও সিএনজি) বিকল্প ব্যবস্থায় কারখানা চালু রাখা হয়েছে।

এবিএম ফ্যাশন লিমিটেডের এজিএম মিলন বলেন, যেখানে ফ্যাক্টরির গ্যাস বিল আসত মাসে কোটি টাকা সেখানে ডিজেল দিয়ে চালানোর ফলে ঘণ্টায় খরচ হচ্ছে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এ অবস্থায় ফ্যাক্টরির বয়লার মেশিন চালাতে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে বায়ারের কাছ থেকে ১ মাস ১৫ দিন অতিরিক্ত সময় চেয়ে নিতে হচ্ছে। তারপরেও সময়মতো ডেলিভারি দেওয়া যাচ্ছে না।এ এলাকার শতভাগ রপ্তানিমুখী অন্তত ২৫টি গার্মেন্টস কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি ও মোবাইলে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া গেছে। খাড়া জোড়া এলাকার এসএ স্পিনিং মিলসে গ্যাস সংকটের কারণে সুতা তৈরির বেশিরভাগ মেশিন চলছে না। এ কারখানায় সুতা তৈরির ৪০টি মেশিন থাকলেও তাদের ১২টি মেশিন ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ। কারখানার সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. তালেবুর রহমান বলেন, ছয় মাস ধরে গ্যাস সংকটে স্পিনিং মিল বন্ধের উপক্রম হয়েছে। যেখানে মোট ৪০টি সুতা তৈরির মেশিন চালাতে ১০ পিএসআই গ্যাস লাগে। সেখানে প্রতিদিন গ্যাসের চাপ পাচ্ছি ১ থেকে দেড় পিএসআই। এ কারণে প্রতি মাসে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছি।

বুধবার কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও সফিপুর এলাকার এবিএম ফ্যাশন লি.র এজিএম মো. মিলন, কেয়া স্পিনিং নিটিং অ্যান্ড ডাইংয়ের জিএম (অ্যাডমিন) পরিমল বাবু, ইসলাম গামের্ন্টস লি.র ম্যানেজার (এইচআর) মি. রেজা, গ্রুপের এজিএম ইউছুফসহ, ওই এলাকার রিপন জিন্স অ্যাপারেল্স লিমিটেড, স্বাধীন গার্মেন্টস লিমিটেড, জিন্নাত অ্যাপারেলস (ডিবিএল), এমএম নিট অ্যাপারেলস লিমিটেড, নোভেলী গার্মেন্টস লিমিটেড, তুসুকা ডেনিম লিমিটেড, কটন ক্লাব (মন্ডল গ্রুপ) লিমিটেড, ফ্যাশন পয়েন্ট লিমিটেড, মেডিট্রাক্স সোয়েটার লিমিটেড, সফিপুর পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার ফারিস্ট, ইকো, অ্যাপেক্স, ডালাস, রহিম টেক্সটাইল ও কোনাবাড়ী বিসিক এলাকার বাজন অ্যাপারেলস, তমিজউদ্দিন, মাসরিকসহ অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে গ্যাসের এমন তীব্র সংকটের চিত্র পাওয়া গেছে।

ফতুল্লা (নারায়ণগঞ্জ) : ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী ও কুতুবআইলের শিল্প-কারখানাগুলোয় এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস নেই। ফলে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা, ৪৫০টি ডাইং কারখানা, স্পিনিং, টেক্সটাইল, রি-রোলিং মিলসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ফতুল্লার সস্তাপুরের এপি নিট ডাইং কারখানার পরিচালক কামাল হোসেন জানান, যেখানে আমাদের উৎপাদন হতো ১০০ টন, সেখানে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন নেমে এসেছে ৩০-৪০ টনে। তাও এ উৎপাদন করতে হচ্ছে নরসিংদী থেকে। সাবকন্ট্রাক্টে অর্ডার দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। এতে লাভ না হলেও পার্টি ধরে রাখার চেষ্টা করছি। এভাবে চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠান চালিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।নিট পোশাক শিল্পের মালিকরা বলেন, এ মুহূর্তে গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে নিটওয়্যার সেক্টর। যেখানে আমাদের ১৫ পিএসআই সংযোগ নেওয়া, সেখানে আমাদের ৭-১০ পিএসআই পর্যন্ত গ্যাসের চাপ থাকে। ৩ মাস ধরে তা আরও কমে মাত্র ০.৫ থেকে ১ পিএসআই-এ দাঁড়ায়। আর এক সপ্তাহ ধরে এ চাপ জিরোতে নেমেছে। ফলে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা বলেন বর্তমানে প্রতিটি কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ। ফলে উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামবে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে একটা বড় ধরনের সংকটে পড়বে নিটওয়্যার সেক্টর।

দেশের অন্যতম স্টিল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের এক কর্মকর্তা বলেন, গ্যাস সংকটে তাদের জ্বালানি চাহিদার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে তাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে প্রতি টন রড উৎপাদন করতে খরচ বেড়েছে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত।

সিরামিক শিল্পের অন্যতম প্রধান উপকরণই গ্যাস। ফলে চলমান সংকটে এই ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতিও হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ফার সিরামিকস লিমিটেডের এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ কমপক্ষে ১০ পিএসআই (চাপের একক) থাকতে হয়। কিন্তু দিনের বেলা বেশিরভাগ সময়ই চাপ থাকে দুই থেকে চার পিএসআই। ফলে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।



© ২০২৪ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT