শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২০, ৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

লুটিয়ে দেয় খুঁটিয়ে খায়

প্রকাশিত : ০৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শনিবার ৩১৪ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

রাজধানীতে জুয়া-হাউজি পুরনো হলেও ক্যাসিনো কালচার (সংস্কৃতি) হাল আমলের। ঢাকার মাঠের এক সময়ের ডাকসাইটে ক্লাবগুলোতে খেলাধুলা লাটে উঠে সেখানে দিব্যি চলছে ক্যাসিনো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী বলছে, রাজধানীজুড়ে ৬০টি ক্যাসিনোর অস্তিত্ব রয়েছে। নেপালি, ভারতীয় ও চীনের জুয়াড়িদের সহায়তায় যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী নেতা এসব অবৈধ ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করতেন। আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা পেছন থেকে এসব ক্যাসিনোয় পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন।

আলোআঁধারির রহস্যঘেরা পরিবেশে নিজস্ব নিরাপত্তার মধ্যে চীন থেকে আমদানি করা অত্যাধুনিক ক্যাসিনো বোর্ডে বাকারা, রুলেটের মতো খেলা হতো। দিন-রাত মিলিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এসব জায়গায় জুয়া খেলতেন। এর সঙ্গে চলত মদ, ইয়াবাসহ নানা মাদকের রমরমা আয়োজন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বড় ক্যাসিনোগুলোতে দিনে গড়ে এককোটি টাকার ওপর জুয়া খেলা হতো।

সূত্র বলছে, ঢাকায় এই ক্যাসিনো কালচারের বয়স ৭-৮ বছরের বেশি নয়। নেপালি জুয়াড়িদের সহায়তায় প্রথমে কলাবাগান ক্লাবের মতো দুই-একটি জায়গায় শুরু হয়। আগে থেকেই জুয়া-হাউজি খেলার চল ছিল এসব ক্লাবে। কিন্তু সনাতনি জুয়ার বোর্ডের চেয়ে ক্যাসিনোতে অনেক বেশি টাকার লেনদেন হওয়ায় খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় এটি। ঢাকার অন্যান্য ক্লাবগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে ক্যাসিনো। মূলত যুবলীগের প্রভাবশালী নেতারা নিয়ন্ত্রণ নেয় একেকটা ক্লাবের। একসময় ফুটবল, ক্রিকেট, হকি খেলার জন্য জনপ্রিয় ক্লাবগুলো খেলার নামগন্ধ মুছে গিয়ে হয়ে ওঠে ক্যাসিনো।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বলছে, রাজধানীর ক্যাসিনোগুলোতে দিনে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার জুয়া খেলা চলত। ক্যাসিনো বোর্ড পরিচালনার জন্য কোনো কোনো ক্যাসিনোতে ২০-৩০ জন নেপালি নাগরিককে আনা হয়েছে। সকাল-সন্ধ্যা, সন্ধ্যা-সকাল দুই শিফটে প্রতিদিন বসত জোয়ার আসর। অবৈধ এসব ক্যাসিনো থেকে হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছিল। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবার চোখের সামনেই বছরের পর বছর চলছিল অবৈধ এ ব্যবসা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি ক্যাসিনো খোলার জন্য মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়েছে কয়েকজন যুবলীগ নেতাকে। আবার প্রতিদিন এসব ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিনই যুবলীগ নেতাদের লাখ টাকার উপরে কমিশন দিতে হতো। এ ছাড়া ক্যাসিনোর আয় থেকে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীকে নিয়মিত বখরা দিতে হতো। এর বিনিময়ে যুবলীগ নেতাকর্মীদের একটা অংশ নির্বিঘ্নে যাতে জুয়া খেলা চলতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিত। স্থানীয় এমপি, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, থানা-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এমনকি মিডিয়াতেও মোটা অঙ্কের বখরা দিয়ে ম্যানেজ করা হতো বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আর এসব অবৈধ ক্যাসিনো থেকে যেহেতু নিয়মিত মোটা অঙ্কের বখরা পাওয়া যেত সে জন্য সবাই এ বিষয়ে চুপ থাকত। বিষয়টা ঠিক বাংলা প্রবাদের মতো- ‘লুটায়ে দে মা খুঁটায়ে খাই’। নিশ্চিন্ত বখরার লোভেই এ নিয়ে কথা বলতেন না।

সূত্র বলছে, ক্যাসিনো, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি থেকে আসা বিপুল পরিমাণ কাঁচা টাকায় একেবারে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিলেন যুবলীগের নেতারা। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ঘুরে বেড়ানো, নির্যাতন করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের দুর্নীতিবাজদের ব্যবহার করে নানা অপকর্মে মেতে উঠেছিলেন। এক নেতা তো জুয়া খেলতে টাকার বস্তা নিয়ে সিঙ্গাপুরে যেতেন। কাঁচা টাকার গরমে তারা এদের পৃষ্ঠপোষকদেরই টেক্কা দিতে শুরু করেন। ফলে বাড়াবাড়ি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আরও বড় দানবে পরিণত হতো তারা। সম্প্রতি যুবলীগ নেতাদের এসব অপকর্মের ফিরিস্তি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সরকারপ্রধানের কাছে দেন।

ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার অপকর্মের আমলনামাও তার কাছে আসে। এ পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগে শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দেন তিনি। শুধু ছাত্রলীগ, যুবলীগ মূল দল আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে সুবিধাভোগী, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, অপকর্মের হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ নেতারা গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের পর যুবলীগকেও ধরেছি। সমাজের সব অসঙ্গতি দূর করব। অপরাধ, অনাচার রোধে যা যা করার করা হবে। যাকে যাকে ধরা দরকার, তাদের ধরা হবে। জানি, কাজটা কঠিন, বাধা আসবেই, কিন্তু জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ফেরাতে সরকার তা করবে।’

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর গতকাল বিকালে রাজধানীর নিকেতন থেকে যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা জি কে শামীমকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তার কার্যালয়ে অভিযানের সময়, নগদ প্রায় দুই কোটি টাকা, পৌনে দুইশ কোটি টাকার এফডিআর, আগ্নেয়াস্ত্র ও মদ পাওয়া যায়। যুবদল থেকে যুবলীগে যোগ দেওয়া শামীম মাত্র কয়েক বছরে রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে। গণপূর্তের কাজগুলোর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। তার নিরাপত্তায় সাতজন গ্যানম্যান ছিল। তাদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে।

এর আগে, গত বুধবার যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তিনি রাজধানীর ফকিরাপুল ইয়ংম্যান্স ক্লাব দখল নিয়ে ক্যাসিনো চালাতেন। তার গুলশানের বাসা থেকে ৫৮৫ পিস ইয়াবা, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া তার ক্যাসিনো থেকে ১৪২ জনকে আটক করা হয়। সেখানে বিপুল পরিমাণ টাকা, মদ ও ইয়াবা পাওয়া যায়। রাজধানীর কমলাপুরে খালেদের একটি টর্চার সেলও পাওয়া গেছে যেখানে নির্যাতনের সব আধুনিক সরঞ্জাম ছিল। ফ্রীডম পার্টি থেকে ছাত্রদল হয়ে যুবলীগ নেতা বনে যাওয়া খালেদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ফকিরাপুলে খালেদের ক্যাসিনোর আশপাশে আরও তিনটি ক্লাব রয়েছে। এগুলো হলো-ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব। সবগুলোই ক্যাসিনো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এসব ক্যাসিনোর মাত্র ৩০০-৫০০ গজের মধ্যে মতিঝিল থানা। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে সবার কাছেই ওপেন সিক্রেট এসব ক্লাবে ক্যাসিনো রয়েছে, আর সেখানে বসে জুয়ার আসর।

তারা জানতেন, এগুলো চালায় যুবলীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। তাদের মাথার ওপর দলটির কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী, এমপিদের আশীর্বাদ থাকায় তারা এতটাই প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ছিল যে, এদের ব্যাপারে অভিযোগ করার সাহস পেতেন না কেউ। উল্টো এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে যেতেন যুবলীগের ক্যাডাররা। চার চারটি ক্যাসিনো নাকের ডগায় চললেও এবং দীর্ঘদিন ধরে এলাকাজুড়ে চাঁদাবাজি চললেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি মতিঝিল থানা পুলিশ। কিন্তু কেন? তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জুয়ার টাকার বখরা নিয়ে নিশ্চিন্ত দিন গুজরানে ব্যস্ত ছিলেন তারা।

জানা গেছে, যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া মালিকাধীন ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবে প্রতিদিন লেনদেন হতো কোটি টাকা। কখনো কখনো সংখ্যাটা কয়েক কোটি টাকায় গড়াত। দুই শিফটে চলা এ ক্যাসিনো ক্লাবটিতে গড়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুইশ জন জুয়া খেলতেন। আর তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল নিয়মিত জুয়াড়ি। তারা প্রত্যেকে গড়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করতেন ক্যাসিনোতে। তবে ক্লাবটিতে ভিআইপিরা জুয়া খেলতেন সর্বনিম্ন ২০ লাখ টাকার স্টেকে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বলছে, রাজধানীর ক্যাসিনোগুলোর একচ্ছত্র সম্রাট হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। গত শনিবার আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায়, নাম উল্লেখ না করে সম্রাটের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ক্রসফায়ার থেকে বেঁচে গেছে সে। ছাত্রলীগের নেতাদের চেয়েও যুবলীগের নেতারা খারাপ মন্তব্য করে তাদের বিরুদ্ধে দমনাভিযানের ইঙ্গিত দেন।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের বড় একটি অংশই মূলত চলে দক্ষিণ যুবলীগেরই সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ছত্রছায়ায়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তার অধীন ক্যাসিনোর সংখ্যা ১৫টিরও বেশি। আর এসব ক্যাসিনো থেকে প্রতিরাতে তার পকেটে ঢোকে ৪০ লাখ টাকারও বেশি।

সূত্র বলছে, রাজধানীর মতিঝিল-বনানী থেকে শুরু করে উত্তরা পর্যন্ত এলাকায় অন্তত ১৫টি ক্যাসিনো চলে সম্রাটের অধীনে। এগুলোর কোনোটি থেকে প্রতি রাতে ২ লাখ টাকা, কোনোটি থেকে ৩ লাখ টাকা, কোনোটি থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্তও চাঁদা জমা হয় সম্রাটের পকেটে। তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ রয়েছে, মাসে অন্তত দশ দিন সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে কাটান তিনি। বস্তাভরে টাকা নিয়ে জুয়া খেলতে যান সম্রাট। সিঙ্গাপুরে তিনি ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত।

১৬৭ কোটি টাকা মদ অস্ত্রসহ যুবলীগের শামীম আটক : বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-মাদক ও বড় অংকের অর্থসহ গ্রেফতার যুবলীগ নেতা পরিচয়ধারী এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে র‌্যাবের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর নিকেতনে ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর ভবনে অভিযানে জি কে শামীমকে গ্রেফতার করার পর সন্ধ্যায় তাকে নিজেদের কার্যালয়ে নিয়ে যায় র‌্যাব।

অভিযানে শামীমের সাত জন দেহরক্ষীকে আটক এবং অস্ত্র, শর্টগান ও গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর তাকে সঙ্গে নিয়ে তার অফিসে তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে ১৬৫ কোটি টাকার বেশি এফডিআর চেক পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর তার মায়ের নামে, বাকি ২৫ কোটি টাকার এফডিআর তার নামে। এ ছাড়া আরও এক কোটি ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

অভিযানের পর র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছে। এখানে তার মায়ের ও তার নামে বিপুল পরিমাণ এফডিআর পাওয়া গেছে। তার অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেও অবৈধ ব্যবহারের অভিযোগ ছিল।

কী ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া অভিযান পরিচালনা করে না। এখন আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দোষ প্রমাণিত হলে তিনি ছাড়া পাবেন।

এফডিআরের অর্থের উৎসের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, কোনো অবৈধ উৎস থেকে এ অর্থ এসেছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। এ বিষয়ে তদন্ত করে মানিল্ডারিংয়ের আইনে মামলা করা হবে।

এ বিষয়ে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, সুনির্দিষ্ট ও টেন্ডারবাজির অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথমে আমরা তার বাসা ঘেরাও করি, সেখান থেকে তার সাত জন দেহরক্ষী আটক এবং অস্ত্র, শর্টগান ও গুলি উদ্ধার করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান না থাকলে কোনো এফডিআর থাকার নিয়ম নেই, অথচ অধিকাংশ এফডিআরই তার মায়ের নামে। সার্বিক বিষয়গুলো তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান র‌্যাবের এ কর্মকর্তা।

জানা গেছে, যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার স্বীকারোক্তিতে বিভিন্ন অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে জি কে শামীমের নামও উঠে আসে। জি কে শামীম যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক বলে লোকমুখে শোনা গেলেও যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী দাবি করেছেন, শামীম যুবলীগের কেউ নয়। তিনি বলেন, তার (শামীম) সঙ্গে যুবলীগের কোনো সম্পর্ক নেই।
রিমান্ডে দেওয়া খালেদের তথ্যের ভিত্তিতেই শামীমকে আটক করে অভিযান চালানো হয়।

দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে শামীমের বাসায় ঢুকে প্রথমেই বিশাল গ্যারেজ দেখতে পান র‌্যাব সদস্যরা। গ্যারেজের পাশে কাচ দিয়ে ঘেরা একটি অফিসকক্ষ, এখানে কর্মচারী ও কর্মকর্তারা বসেন। ওই ঘরের পাশে দুটি দামি মোটরসাইকেল রাখা আছে। কক্ষের পাশে দুই পাল্লার একটি কাঠের দরজা। দরজার দামি কাঠের চৌকাঠ চোখে পড়ার মতো। দরজা দিয়ে ঢুকতেই ভেতরে তিন তলায় যাওয়ার সিঁড়ি। মার্বেল টাইলসের সিঁড়িটিতে রয়েছে নকশা করা কাঠের রেলিং। চারতলা পর্যন্ত উঠে গেছে সিঁড়িটি। পুরো বাসাটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। তৃতীয় তলায় শামীমের বসার কক্ষ। প্রায় ৩০ ফুট লম্বা ও ২০ ফুট চওড়া কক্ষটি। পুরো কক্ষটিতে দামি বাতি, কাঠ দিয়ে সাজানো। ওই কক্ষের পাশেই আছে শামীমের ব্যক্তিগত কক্ষ। জি কে শামীমকে আটকের সময় তার কক্ষে টাকার পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, গুনে কূল পাচ্ছিলেন না র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেটসহ কর্মকর্তারা। আর তাদের সঙ্গেই বসে ছিলেন জি কে শামীম। পরনে একটি হ্যাফ শার্ট ও প্যান্ট।

রাজধানীর সবুজবাগ, বাসাবো, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম সাংবাদিক দেখে হতভম্ব হয়ে যান। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আল্লাহর ওয়াস্তে ছবি তুইলেন না, আমাকে বেইজ্জতি কইরেন না। আমার একটা সম্মান আছে। এখানে যা হচ্ছে, আপনারা দেখছেন। কিন্তু আমাকেও আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দিতে হবে। এ সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্লিজ ছবি তুলবেন না। তার এ কথা শুনে র?্যাবের এক কর্মকর্তা শামীমকে বলেন, আপনি আমাদের সহযোগিতা করেন। আমাদের সহযোগিতার জন্য ও অভিযানের সচ্ছতার জন্য মিডিয়া আমাদের সহযোগিতা করছে।

অভিযানের পুরো সময়টুকু নিজেকে ক্যামেরা থেকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন শামীম। কখনও দাঁড়িয়ে, চেয়ারে বসে, হাত দিয়ে মুখ ঢাকছিলেন তিনি। আবার এটা-ওটা খোঁজার জন্য দীর্ঘক্ষণ টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়েও রাখেন।

ডজন সম্মাননা পদক
বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-মাদক ও বড় অংকের অর্থসহ গ্রেফতার যুবলীগ নেতা পরিচয়ধারী এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের কার্যালয়ে অন্তত ১৩টি সম্মাননা পদক পাওয়া গেছে। ‘ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংগঠন এবং সমাজসেবায় অবদান রাখায়’ বিভিন্ন সময় তাকে এ সম্মাননা পদক দিয়েছে নানা সংগঠন। তার পাওয়া পুরস্কারের তালিকায় রয়েছে- ফিদেল কাস্ত্রো অ্যাওয়ার্ড ২০১৭, মাদার তেরেসা গোল্ড মেডেল-২০১৭, অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল-২০১৭, মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড-২০১৭, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক-২০১৮ প্রভৃতি।

যুবলীগ নেতা খালেদকে বহিষ্কার : অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যুবলীগের শিক্ষা ও পাঠাগার সম্পাদক এবং মিডিয়া সমন্বয়ক মিজানুল ইসলাম মিজু এ তথ্য জানান। মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং অসামাজিক কার্যকলাপের দায়ে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

জানা গেছে, রাজধানীর ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবে ‘ক্যাসিনো’ চালানোর অভিযোগে গত বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর গুলশানের নিজ বাসা থেকে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ সময় তার বাসা থেকে একটি অবৈধ পিস্তল, ছয় রাউন্ড গুলি, ২০১৭ সালের পর নবায়ন না করা একটি শটগান ও ৫৮৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

এর পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে গুলশান থানায় নেয় র‌্যাব। পরে তার বিরুদ্ধে একই থানায় অস্ত্র, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে আলাদা তিনটি মামলা দায়ের করেন র‌্যাব-৩-এর ওয়ারেন্ট অফিসার গোলাম মোস্তফা। গত বৃহস্পতিবার রাতে খালেদ মাহমুদকে আদালতে উপস্থাপন করলে অস্ত্র মামলায় চার দিন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা মামলায় তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে রাতেই মামলা দুটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি, উত্তর) স্থানান্তর করা হয়। একই সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত থেকে খালেদ মাহমুদকে নিয়ে যায় ডিবি।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT