শনিবার ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রক্ষকই ভক্ষক

প্রকাশিত : ০৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ, ২৪ জুলাই ২০২২ রবিবার ২০ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

অপরাধ দমনের দায়িত্ব যাদের ঘাড়ে, সেই পুলিশই জড়িয়ে পড়ছে ভয়ঙ্কর অপরাধে। রাজধানীসহ সারাদেশে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে পুলিশ। খুন, অপহরণ, মাদক কেনাবেচা, ছিনতাই, জমি দখল, ধর্ষণ, প্রতারণাসহ ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এই বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশের এমন অপরাধ প্রবণতায় জনমনে মূর্তিমান আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে এই সুশৃঙ্খল বাহিনী। কিছু অসাধু সদস্যের কারণে গোটা পুলিশ বাহিনী নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।

প্রতিদিনই পুলিশ সদর দফতরে সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমছে। পুলিশ দফতর সূত্র জানায়, গত চার বছরে বিভিন্ন অভিযোগে সারাদেশে প্রায় ৬৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গড়ে মাসে ১৩৫৫ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এদিকে চলতি ছয় মাসে পুলিশের বিরুদ্ধে প্রায় দেড় হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত রবিবার গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনে এক স্বর্ণ দোকানের কর্মচারীর কাছ থেকে ৩৮ ভরি ১৪ আনা স্বর্ণালঙ্কার ছিনতাই করে একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। এই চক্রে পুলিশের কয়েক সদস্য জড়িত রয়েছে। ওই স্বর্ণ ছিনতাই চক্রের হোতা রূপনগর থানার এএসআই জাহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করে গত মঙ্গলবার চার দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। পরে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে আরও চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে এএসআই জাহিদুলের ছিনতাইকারী চক্রের নানা কাহিনী।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছিনতাইকারীর বিশাল বাহিনী রাজধানীতে গড়ে তুলেছেন। এমন পিলে চমকানো কাহিনী শুনে পুলিশ বিভাগে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রূপনগর থানার এসআই মাসুদুর রহমানকে (মাসুদ) থানা থেকে ক্লোজ করে মিরপুর উপ-পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে পুলিশের অপরাধ কমাতে কঠোর অবস্থানে সরকার। আর তাই এ বিষয়ে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছেন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের কোন সদস্য অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধের বিচারও করা হয় বিভাগীয় আইনে। এক্ষেত্রে অভিযুক্তদের ‘বিভাগীয় শাস্তির আওতায়’ আনার কথা বলে আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত এবং বিচারও করে পুলিশ। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তারা জানান, উন্নত বিশ্বে পুলিশের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ এলে আলাদা কমিশন করে তার বিচার করা হয়।

বাংলাদেশেও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন বা নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন কমিশন গঠনের ব্যাপারে মত দিয়েছেন তারা। এতে অপরাধ অনেকাংশে কমবে বলেও মনে করছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গাবতলীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় পুলিশ সদর দফতর এই ঘটনাটি নজর রাখছেন। এর আগে পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ, মাদক কারবার, নির্দোষ ব্যক্তিদের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছিল। সদর দফতর সূত্র জানায়, গত ছয় মাসে এসব নানা অভিযোগে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

এ ছাড়া কয়েক হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে পুলিশ সদর দফতরে। গত বছর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল দ্বিগুণ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, পুলিশের মতো একটি বিশাল বাহিনীর সদস্যদের ব্যক্তিগত অপকর্ম বা অপরাধের দায় কর্তৃপক্ষ নেবে না। বর্তমান পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিত সংগঠিত। এখানে কেউ অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যারাই ধরা পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। তাদেরও আইনগত সহায়তার অধিকার রয়েছে। তারা আদালতে নির্দোষ প্রমাণের রায় নিয়ে পুনরায় বাহিনীতে ফিরে আসে।

এর আগে দায়ী পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ। এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার মোহাঃ শফিকুল ইসলাম জানান, পুলিশের কোন সদস্যে অপরাধ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে অনেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না।

এদিকে গাবতলীতে স্বর্ণ ডাকাতির ঘটনায় পুলিশ জড়িত থাকার বিষয়ে বৃহস্পতিবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশিদ জানান, আইন সবার জন্য সমান। আইনের উর্ধে কেউ নন। দুই লাখের ওপরে সদস্য আছে পুলিশ বাহিনীতে। কোন ব্যক্তির দায় পুলিশ বাহিনী নেবে না। আগেও নেয়নি, ভবিষ্যতেও নেবে না। তিনি জানান, রাজধানীর গাবতলীতে র্স্বণ ডাকাতির মামলায় আসামি রূপনগর থানার এএসআই জাহিদুলকে রিমান্ডে দেয়া হয়।

ডাকাতির ঘটনায় এএসআই জাহিদুলের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেই তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। পলাশ শেখ ছিল পুলিশের সোর্স। তাকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করব, পুলিশের আর কেউ যদি ডাকাতিতে জড়িত থাকে, তা হলে তার শাস্তি সে পাবে। এ ঘটনার সঙ্গে আরও কয়েকজনের নাম আমরা পেয়েছি। তবে তাদের নাম বলছি না। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দারুস সালাম থানার এসআই বায়েজীদ মোল্লা জানান, গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার রূপনগর থানার সহকারী দারোগা জাহিদুলকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। রিমান্ডে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তার যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এএসআই জাহিদুলকে রূপনগর থানার ‘হোন্ডা টহল টিম’-এর সদস্য ছিলেন। রবিবার গাবতলী বেড়িবাঁধ এলাকায় ঘটনাস্থল এবং আশপাশের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। এতে স্বর্ণ ছিনতাইয়ে এএসআই জাহিদুলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়।

এ ছাড়া ছিনতাইয়ের শিকার স্বর্ণ দোকানের কর্মচারী টিটু প্রধানিয়ার দায়ের করা মামলার এজাহারে দেয়া মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন নম্বর বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিতে (বিআরটিএ) যাছাই করে পুলিশ জানতে পেরেছে, মোটরসাইকেলটি এএসআই জাহিদুলের। এর পরই তাকে রবিবার সন্ধ্যায় রূপনগর থানা থেকে ক্লোজ করে মিরপুর উপপুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে সংযুক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

পুলিশ জানায়, পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারের ধানসিঁড়ি চেন এ্যান্ড বল হাউজ নামের স্বর্ণের দোকানে চাকরি করেন টিটু। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জুয়েলারির অর্ডার করা স্বর্ণের গহনা তিনি পৌঁছে দেন। রবিবার সকালে তিনি তাঁতিবাজারের ওই প্রতিষ্ঠান থেকে স্কুল ব্যাগে ৩৮ ভরি ১৪ আনা স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে টাঙ্গাইল জেলায় যাচ্ছিলেন। সকাল পৌনে ৮টার দিকে গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে টাঙ্গাইলের বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

এ সময় অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ডিবি পরিচয় দিয়ে তার ব্যাগে কী আছে জানতে চান। কয়েক মিনিটের মধ্যে আরও ৪-৫ জন এসে যোগ হয় ওই ব্যক্তির সঙ্গে। এক পর্যায়ে টিটুর কাছ থেকে স্বর্ণালঙ্কার থাকা ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে রবিবার রাতে দারুস সালাম থানায় মামলা করেন। এতে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়। এজাহারে ওই মোটরসাইকেলের নম্বর সংযুক্ত করা হয়। মোটরসাইকেলের সূত্র ধরে রূপনগর থানার এএসআই জাহিদুলকে শনাক্ত করেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা সূত্রে জানা যায়, রবিবার সকালে গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের সময় এএসআই জাহিদুল নিজের মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো ল-৫৬-৬৪৩৮) ব্যবহার করেন।

থানায় নেয়ার নামে স্বর্ণ দোকানের কর্মচারী টিটুকে মোটরসাইকেলে উঠিয়ে গাবতলী বেড়িবাঁধে নেয়া হয়। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন এএসআই জাহিদুল নিজেই। পরে টিটুর কাছে থাকা ৩৮ ভরি ১৪ আনা স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, রূপনগর থানা পুলিশের ‘হোন্ডা টহল টিম’ নামে একাধিক টিমের মধ্যে একটির নেতৃত্ব দিতেন এসআই মাসুদুর রহমান। এই হোন্ডা টিমের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

এই হোন্ডা টিমের সদস্য ছিলেন গ্রেফতারকৃত এএসআই জাহিদুল। স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনায় এসআই মাসুদ পুলিশের সন্দেহের তালিকায় আছেন। যে কারণে তাকে রবিবার রাতে থানা থেকে ক্লোজ করে ডিসি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, রাজধানীর ৫০টি থানায় পুলিশের একাধিক মাঠ পর্যায়ে পুলিশ টিমের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। টিমের কিছু পুলিশ সদস্যের সঙ্গে মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের সখ্য রয়েছে। আবার কোন পুলিশ সদস্যের সাধারণ মানুষের পকেটে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য ঢুকিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেককে মাদক মামলা দিয়ে চালান করে দেয়া হচ্ছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগ সাধারণ মানুষের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এর আগে গত ৮ জুলাই চট্টগ্রামে ইয়াবাসহ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বিশেষ শাখার (সিটিএসবি) কনস্টেবল উপল চাকমা (৪৫), নান্টু দাশ (৪২), মোঃ কামরুল ইসলাম (৩০) ও মোঃ গিয়াসউদ্দিন (৪২) নামে চারজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে ৫ হাজার ২৬০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

এদিকে ১৪ জুলাই ফরিদপুরের ভাঙ্গা বাজারে এএসআই বাবুলের ভাড়া বাসা থেকে ৪০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করে। এ সময় বাবুল ও তার সহযোগী পুলিশ সোর্স মেহেদী হাসান মৃদুল মুন্সীকে গ্রেফতার করা হয়। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগে এএসআই বাবুল ও তার সহযোগী মেহেদীকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

ওইদিন ফরিদপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গ্রেফতারকৃত এএসআই বাবুল ঢাকা জেলার ধামরাই থানার গাংগুটিয়া গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে। আর ভাঙ্গা পৌরসভার হোগলাডাঙ্গী সদরদীর মিজানুর রহমান মুন্সির ছেলে মেহেদী হাসান মৃদুল মুন্সী।

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৭ জুলাই রাতে ভাঙ্গা পৌর সদরের বাজারের স্বর্ণকারপট্টির পলাশ বণিকের সোনারতরী জুয়েলার্স থেকে কয়েকটি স্বর্ণের বার কেনেন নড়াইলের লোহাগড়ার পাপ্পু বিশ্বাস নামের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী। সেখান থেকে রাত সাড়ে ১২টায় একটি ভ্যানগাড়িতে পাপ্পু ও তার বন্ধু বিজয় লোহাগড়ার উদ্দেশে রওনা দেন।

স্বর্ণপট্টি পার হতেই এএসআই বাবুল ও তার সহযোগী তাদের গতিরোধ করেন। এ সময় চোরাই স্বর্ণ পাচার করছেন, এমন অভিযোগ তুলে পাপ্পুকে অস্ত্রের মুখে ভয় দেখান এএসআই বাবুল। পরে তার পকেটে থাকা মোট ১১টি স্বর্ণের বারের মধ্যে চারটি স্বর্ণের বার ছিনিয়ে নেন এএসআই। এ সময় তাদের চুপচাপ চলে যেতে বলেন তারা। এ ব্যাপারে ভাঙ্গা বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পলাশ বলেন, ছিনতাই হওয়া স্বর্ণের বারগুলোর ওজন প্রায় ৪০ ভরি, যার বাজার মূল্য ২৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা।

ভাঙ্গা থানার ওসি সেলিম রেজা জানান, এ ঘটনায় ভাঙ্গা থানায় মামলা হয়েছে। এএসআই বাবুল হোসেন ও তার সোর্স মেহেদী হাসানকে আটক করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এএসআই বাবুল হোসেনের বাসা থেকে ৪০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভাঙ্গা সার্কেল) ফাহিমা কাদের চৌধুরী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, এ ঘটনায় মামলা রুজু হয়েছে। বিষয়টির তদন্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি গে-ারিয়া কবরস্থানে এক ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে ইয়াবাসহ মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে কিছু পুলিশ সদস্য। এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এ ছাড়া ১৪ জুলাই ইংলিশ রোড মালিটোলা বিপণি বিতানের সামনে থেকে ৪০ নং শাখারীবাজারের দত্ত ভা-ারের মৃত নীলকান্ত দত্তের ছেলে ঝুলন দত্ত মন্ট্রিকে ধরে বংশাল থানার এসআই রায়হান। ওই পুলিশ কর্মকর্তার পাশে থাকা পুলিশ সোর্স মন্ট্রির পকেটে ২০ পিস ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে থানায় ধরে নিয়ে যায়।

এ সময় এসআই রায়হান মন্টির মা পঙ্গু ঝর্ণা দত্তের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। মন্ট্রির মা ঝর্ণা দত্ত জানান, এত টাকা পাব কোথায়। টাকা না দেয়ায় আমার নিরপরাধ ছেলে মন্ট্রিকে মাদক মামলায় ১৫ জুলাই জেলহাজতে পাঠানো হয়। মামলা নম্বর ২২। আমি বিষয়টি বংশাল থানার ওসিকে জানিয়েছিলাম। তিনি কোন ব্যবস্থা নেননি।

পুরান ঢাকার দুই থানা এলাকা ছিনতাইকারী, টানা পার্টি, মাদক ব্যবসায়ীসহ নানা অপরাধ কর্মকা- এখানে ওপেন সিক্রেট। নয়াবাজার নবাব ইউসুফ মার্কেটের তিনতলার ছাদে এদের জমজমাট আড্ডা বসে। রাতে নয়াবাজারের সামনে টানা পার্টি সদস্যরা দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজারে শত শত মালবাহী ট্রাক থেকে মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে গলিপথে পালিয়ে যায় তারা।

এদের জ্বালায় অতিষ্ঠ দেশের বৃহৎ পাইকারি পুরান ঢাকার বাজার বাবুবাজার চালের আড়ত, ফলপট্টি, কাগজ মার্কেট, ওষুধ মার্কেটসহ ২০টি পাইকারি ব্যবসায়ীরা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জানান। তারা অভিযোগ করেন, থানা পুলিশ এদের সবাইকে চেনে ও জানে। তারা থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে দিনরাতে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অনেক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের সখ্য রয়েছে। অনেকে মাদক সেবনও করেন। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, গোপন তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে অনেক রাঘব বোয়ালের নাম।

এদের মধ্যে কয়েক পুলিশ সদস্যের নাম বেরিয়ে আসবে বলে জানান তারা। এ ছাড়া পুরান ঢাকা নর্থ সাউথ রোড, ইংলিশ রোডের বিদ্যুত অফিস সংলগ্ন, মালিটোল বিপণি বিতান, নবাব ইউসুফ রোড এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তা দখল করে শত শত ট্রাক ও ৪২ ট্রান্সপোর্টের ভারি যানবাহন স্ট্যান্ড করে থাকে। এতে এলাকায় ভয়াবহ যানজটে অতিষ্ঠ ২০টি এলাকার লক্ষাধিক বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। এই কারণে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ হাসপাতাল মিটফোর্ড হাসপাতালে রোগীরা যাতায়াতে চরম দুর্ভোগে পড়েন। সংশ্লিষ্টরা জানান, আর প্রতিদিন রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে মাস্টার মাইন্ড চাঁদাবাজদের কারসাজি।

এরা সিটি কর্পোরেশনের ড্রেস পরে শত শত যানবাহন থামিয়ে চাঁদা আদায় করে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে মাস্টার মাইন্ড চাঁদাবাজ স্থানীয় খোকন, শফিক, রাসেল, মেথর মানিকসহ ১০-১২ চাঁদাবাজ। এরা প্রতি সপ্তাহে থানা পুলিশকে আড়াই লাখ টাকা বকশিশ দিয়ে নিজেদের অপকর্ম জায়েজ করে বলে সংশ্লিষ্ট যানবাহন মালিক ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন। এভাবে চাঁদাবাজি করে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছে তারা। এ ব্যাপারে নয়বাজার মাছ-মাংস ও কাঁচামাল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ মন্টু মিয়া উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তার দফতর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অভিযোগ করেছেন।

এদিকে সারাদেশে পুলিশের কিছু সদস্যদের অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়া নিয়ে পুলিশ সদর দফতরে উর্ধতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ। এমন পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে দায়ীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পুলিশ বাহিনীতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানান। অপরাধ বিশ্লেষজ্ঞরা পুলিশ বাহিনীতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আইজিপির সক্ষমতা বাড়ানোসহ বাহিনীটিকে ঢেলে সাজানোর বিষয়ে মত দিয়েছেন।

তাদের মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবেই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দিন দিন অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কঠোর শাস্তি না হওয়ায় পুলিশের বিপথগামী সদস্যরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশে কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে তাদের বড়জোর বদলি বা সাসপেন্ড করা হয়। অন্যদিকে চার্জশীট দুর্বল হওয়ার কারণে অপরাধীদের সুষ্ঠু বিচারও নিশ্চিত হয় না। তাই পুলিশে অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনতে এই বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর কোন বিকল্প নেই।

অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি হয় না পুলিশের ॥ পুলিশের গুরুতর অপরাধেও দেয়া হয় লঘু দণ্ড। কোন কোন ক্ষেত্রে অপরাধ করেও শাস্তি পেতে হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিভাগীয় শাস্তির নামে যেসব শাস্তি দেয়া হয়, বিশেষজ্ঞদের মতে তা আসলে কোন ধরনের শাস্তিই নয়। এমনটাই ঘটছে পুলিশ সদস্যদের অপরাধের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া পুলিশের কোন সদস্য অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হচ্ছে না।

অনেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধের বিচারও করা হয় বিভাগীয় আইনে। এক্ষেত্রে অভিযুক্তদের ‘বিভাগীয় শাস্তির আওতায়’ আনার কথা বলে আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত এবং বিচারও করে পুলিশ। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত বিশ্বে পুলিশের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ এলে আলাদা কমিশন করে তার বিচার করা হয়। বাংলাদেশেও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন বা নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন কমিশন গঠনের ব্যাপারে মত দিয়েছেন তারা। এতে অপরাধ অনেকাংশে কমবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১৭ সালের ১৩ নবেম্বর সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক আইজিপি কমপ্লেইন সেল চালু করার পর থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে বেশি।

পুলিশ জানায়, পুলিশ আইন অনুযায়ী, কোন পুলিশ সদস্য অপরাধমূলক কাজে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দুই ধরনের বিভাগীয় শাস্তির (লঘু ও গুরু) বিধান আছে।

গুরুদণ্ডের আওতায় চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত ও চাকরিকালীন সুযোগ-সুবিধা রহিত করা হয়। অপরাধ প্রমাণ হলে বরখাস্ত করা হয়। গুরুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপীলের সুযোগ আছে। ছোট অনিয়ম বা অপরাধের জন্য দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, অপারেশনাল ইউনিট থেকে পুলিশ লাইন্স বা রেঞ্জে সংযুক্ত করে লঘুদণ্ড দেয়া হয়। বিসিএস ক্যাডারের পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ (শৃঙ্খলা ও আপীল) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়। সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে তদুর্ধ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগে একটি সেল রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ডোপটেস্টে পজিটিভ হওয়ায় অর্থাৎ মাদক সেবনের দায়ে চাকরিচ্যুত ১০৬ জনের মধ্যে ৭ জন আপীল করেছেন। চাকরিচ্যুতরা কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) ও সার্জেন্ট পদে কর্মরত ছিলেন। পুলিশের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব সদস্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের বিষয়ে জানতে চেয়ে স্থায়ী ঠিকানা সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

২০২০ সালের মাঝামাঝিতে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) ডোপ টেস্ট শুরু হয়। প্রথম অবস্থায় ৩০ জন সদস্য শনাক্ত হওয়ার পর তদন্ত শেষে ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার মোহাঃ শফিকুল ইসলাম জানান, মাদক সেবনের জন্য যেসব পুলিশ সদস্যের চাকরি চলে গেছে তারা পুলিশিং সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। তাদের অভিজ্ঞতা যেন অপরাধমূলক কর্মকা-ে ব্যবহার হতে না পারে এ জন্য এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে তারা যেন সামাজিকভাবে হেয় না হয় সেটাও খেয়াল রাখা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে সারাদেশে প্রায় ৬৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গড়ে মাসে ১১শ’ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শাস্তি পাওয়া পুলিশের সংখ্যা ১০ হাজার ৪২১ জন। ২০১৬ সালে ১৩ হাজার ৫৮৬, ২০১৫ সালে ১১ হাজার ১৬৭, ২০১৪ সালে ১৫ হাজার ২৯৭, ২০১৩ সালে ১৪ হাজার ৬০ এবং ২০১২ সালে ১২ হাজার ৯৯২ জন পুলিশ সদস্য অপরাধ করে শাস্তি পেয়েছেন। তবে শাস্তি পাওয়া অধিকাংশ পুলিশ সদস্য উচ্চ আদালতে আপীল করে চাকরিতে ফিরে আসছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লঘুদণ্ড পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৩৩৩ জন পুলিশ সদস্য। একই সময়ে গুরুদণ্ড পেয়েছেন ৩ হাজার ৯৯১ জন। এর মধ্যে চাকরিচ্যুতি বা বরখাস্ত হয়েছে ৫০৬ জনকে। বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে ৩৬ জনকে। পুলিশের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, শাস্তি পাওয়া এসব পুলিশ সদস্যের বেশিরভাগই আপীল করে চাকরিতে ফিরে গেছেন।

সিআইডি কর্মকর্তা আকসাদুদ জামানের অপরাধ কর্মকা- ॥ ?গত বছর ১৯ অক্টোবর রাজধানীর কাওলা থেকে এক প্রবাসীর টাকা ও কাপড়ভর্তি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যান পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) আকসাদুদ জামান। ওই ব্যাগে ৫ হাজার ইউএস ডলার, ২ হাজার দেরহাম, ২ হাজার টাকা, ২টি মোবাইল ছিল। এ ঘটনায় ৬ জনকে গ্রেফতার করা হলেও পলাতক ছিলেন এসআই আকসাদুদ জামান। অবশেষে প্রায় এক বছর পর গত ৮ সেপ্টেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকা থেকে সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। ডিবির এক উর্ধতন কর্মকর্তা জানান, ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর আকসাদুদ জামানকে অনেক আগেই পুলিশ থেকে বরখাস্ত করা হয়। ওই ডাকাতির ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন না। পরে আমাদের তদন্তেই তার নাম বেরিয়ে আসে।

ডাকাতির ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ডিবির এ কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের ১৯ অক্টোবর ভোর পৌনে ৭টায় ভুক্তভোগী বিদেশগামী ওই যাত্রী টিকাটুলীর বাসা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিক্সাযোগে হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য বের হন। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কাওলা ফুট ওভার ব্রিজের নিচে পৌঁছলে ১টি মাইক্রোবাস অটোরিক্সার গতিরোধ করে। এরপর মাইক্রোবাস থেকে দুজন নেমে ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীকে তার লাগেজসহ মাইক্রোবাসে তুলে নেন। তাকে হাতকড়া পরিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সঙ্গে থাকা ব্যাগ ছিনিয়ে নেন। সকাল ৯টার দিকে রামপুর স্টাফ কোয়ার্টার্স এলাকায় ভুক্তভোগীকে রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যায় আসামিরা। তিনি বলেন, এ ঘটনায় ২০ অক্টোবর বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করেন ভুক্তভোগী। মামলাটি তদন্তের ধারাবাহিকতায় প্রথমে ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েক সাক্ষী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দী থেকে জানা যায়, সিআইডি ডেমরা জোনে কর্মরত বরখাস্ত হওয়া এসআই মো. আকসাদুদ জামান এ ঘটনার নেতৃত্ব দিয়েছে। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয়।

মাদক কেনাবেচা ও আসক্ত অনেক পুলিশ সদস্য ॥ গত বছর ৩১ আগস্ট হবিগঞ্জের মাধবপুরে গাঁজা পাচারকালে পুলিশ সদস্য মনির হোসেনসহ ২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা হলেন- মাধবপুর থানার পুলিশ কনস্টেবল মনির হোসেন ও উপজেলার উত্তর বেজুড়া গ্রামের শাকিল মিয়া (২৮)। গত ২২ আগস্ট যশোরে ফেনসিডিল ও ইয়াবাসহ দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত কনস্টেবল আজম মোল্লা যশোর চাঁচড়া ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন আর মোহাম্মদ মুজাহিদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ থেকে আগেই সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন।

তার আগে গত বছর ১০ আগস্ট দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইয়াবা উদ্ধার অভিযানে গিয়ে আসামির কাছ থেকে উদ্ধার করা ইয়াবা ও টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ৩ পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় থানার এক সোর্সসহ আরও ৩ জন গ্রেফতার হন। গ্রেফতারকৃত তিন পুলিশ সদস্য হচ্ছে, সাতকানিয়া থানার ঢেমশা তদন্ত কেন্দ্রের কনস্টেবল বিমল চাকমা (৪৬), শাহ মোহাম্মদ হাসান (২৭), আরাফাত নাজিম উদ্দীন (২৬)।

ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যরা ॥ গত বছর ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে ফিল্মি স্টাইলে মা ও ছেলেকে অপহরণের পর ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের প্রাক্কালে সিআইডির এএসপি সারোয়ার কবীর, এএসআই হাসিনুর রহমান ও কনস্টেবল আহসানুল উল ফারুক, ফসিউল আলম পলাশ ও হাবিব মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গত ১০ আগস্ট ফেনীতে পুলিশ সদস্যদের অসাধু একটি চক্র স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে স্বর্ণ লুট করে। এ ঘটনা দেশব্যাপী আলোচিত হয়। ঘটনায় পুলিশের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের আসামি করে মামলা করা হয়। তারা হচ্ছে, ডিবির পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম, উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোতাহের হোসেন, মিজানুর রহমান, নুরুল হক এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) অভিজিত বড়ুয়া ও মাসুদ রানা।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি পুলিশের ছয় সদস্য গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে, কনস্টেবল আব্দুল নবী, এসকান্দর হোসেন, মনিরুল ইসলাম, শাকিল খান, মোঃ মাসুদ ও মোর্শেদ বিল্লাহ। গত বছরের ৭ মে গাজীপুরে এক অটোরিক্সা চালকের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় হাইওয়ে পুলিশের তিন সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

অপরদিকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে সূত্রাপুর থানা পুলিশের এসআই রহমাত উল্লাহ ও এএসআই রফিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করে পল্টন থানা পুলিশ। গত বছরের ২০ জুন তাদের গ্রেফতার করা হয় ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান জানান, পুলিশে যে অপরাধ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হলে পুলিশ বাহিনীকে অবশ্যই ঢেলে সাজাতে হবে। আইজিপির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা না হলে পুলিশে শৃঙ্খলা থাকবে না। এখনও শুধু কনস্টেবল থেকে ওসি পর্যন্ত পুলিশ সদস্যরা অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন আইজিপি। যদি একজন ডিসি, এসপি, ডিআইজি র‌্যাংকের কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কোন সুযোগ বা সিস্টেম নেই। তাই আমি মনে করি আইজিপির সক্ষমতা বৃদ্ধি করার কোন বিকল্প নেই। পুলিশের মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের ওপর বেশি নজর দেয়া প্রয়োজন। তারা মাঠে বেশি দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ থাকে। বিশেষ করে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও এসআই মামলার তদন্ত ও নিষ্পত্তিতে জড়িত থাকেন। তাদের মধ্যে ক্ষমতার চর্চার প্রবণতা দেখা যায় বেশি। এ জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ক্লোজ কিংবা ট্রান্সফার যদিও একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, তার পরও বিচার না হলে অনেকেই এ ধরনের অপরাধে উৎসাহী হয়ে পড়বেন। সে জন্য কঠিন বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা জানান, রক্ষক যদি ভক্ষক হয় তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের একটা বিশ্বাসের ঘাটতি হয়। পুলিশের মতো একটি বাহিনীতে নৈতিক মানদণ্ড ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তার কর্মকাণ্ড মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে অপরাধগুলোর বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে তা কমিয়ে আনা সম্ভব।

এ ব্যাপারে সাবেক পুলিশ প্রধান এ কে এম শহীদুল হক জানান, কোন পুলিশ সদস্যের যদি ব্যক্তিগত নৈতিকতা না থাকে, তাহলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তা বন্ধ করা কঠিন। কারা কখন অপরাধপ্রবণ হয় তা বলাও মুশকিল। আর পুলিশ অপরাধ করলে মানুষের মধ্যে খারাপ ধারণা হয়। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে শক্ত তদারকি প্রয়োজন। এমনকি কয়েকদিন পর পর পুলিশ সদস্যদের ট্রেনিং, ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তা হলে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যের মাঝে অপরাধপ্রবণতা কমে অসবে। বিশেষ করে থানার ওসি ও পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জানে তার কোন্ পুলিশ সদস্য কি রকম। তার দায়িত্বটা বেশি। নৈতিকতা হারানো ওই পুলিশ সদস্যর প্রতি তীক্ষœ নজরদারি করতে হবে। তদারকি বাড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে পুলিশ সদস্যদের অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে। এলাকায় কোন অপরাধের ঘটনা ঘটলে অবশ্যই থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নজরে যাবে। তখনই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে বলে মনে করেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT