শুক্রবার ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মওলানা ভাসানীর নেতৃত্ব

প্রকাশিত : ০৭:৪৪ পূর্বাহ্ণ, ১৭ নভেম্বর ২০২১ বুধবার ২০ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কাদের নেতা ছিলেন? তিনি কি কৃষকের নেতা, শ্রমিকের নেতা, মধ্যবিত্তের নেতা ছিলেন? তিনি কি সংসদীয় রাজনীতিতে অনাগ্রহী ছিলেন? তিনি কি প্রতিষ্ঠানবিরোধী ছিলেন? আমৃত্যু কি সংগ্রামী ছিলেন? প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ সূচক হবে নিঃসন্দেহে।

একজন ভূমিহীন কৃষকের সন্তান হয়ে তার পক্ষে কৃষকের দৈনন্দিন জীবন-কষ্ট বোঝা খুবই স্বাভাবিক ছিল। তাই আসামে গিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করে যে রাজনীতি শুরু করলেন, তা পাকিস্তান যুগেও অব্যাহত রেখেছিলেন। কৃষকদের বাইরে অন্যান্য শ্রমজীবীর সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল। তাদের রাজনীতি তাকে আকৃষ্ট করত। এক সময় তিনি শ্রমিক সংগঠনে ভূমিকা রাখতে শুরু করলেন।

পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর মুসলিম লীগ যেভাবে দল ও দেশ পরিচালনা করা শুরু করল, তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে মুসলিম লীগের নেতাকর্মীরা অচিরেই নতুন রাজনীতির দিশা খুঁজতে লাগলেন। আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী পাকিস্তান যুগে মুসলিম লীগের রাজনীতি ত্যাগ করে এ দেশের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনে এগিয়ে এলেন। পূর্ব বাংলার সদ্য গঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি শুরু করল। তিনি আসাম প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য ছিলেন, পূর্ব বাংলায় এসে উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ টাঙ্গাইলের আসনে এমএলএ নির্বাচিত হলেন স্থানীয় জমিদারকে হারিয়ে দিয়ে। কিন্তু সংসদীয় রাজনৈতিক বক্তৃতা, মাসিক ভাতা, সংসদ সদস্যের মর্যাদা তাকে ধরে রাখতে পারল না। মাঠ তাকে টানত, তাই তিনি মাঠের রাজনীতি অর্থাৎ গণমানুষের রাজনীতিতে ফিরে গেলেন। তার চলনে-বলনে গণমানুষের প্রতিফলন ছিল আজীবন। খদ্দর বা এ ধরনের কাপড়ের পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, মাথায় প্রথমদিকে সাদা কাপড়ের, পরে তালের আঁশের টুপি-এই ছিল তার সবসময়ের পরিচ্ছেদ। সংসদে বসে, বিদেশি নেতা বা দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ, জনসভা-মিছিলে তিনি এ পরিচ্ছেদে থাকতেন। এই পোশাক ও বাঁশ-খড়ের চালে নির্মিত সাধারণ কৃষকের কুটিরের মধ্যে বসবাস তাকে জনতার কাতারে নিয়ে গেছে। গান্ধীও শুধু খালি গায়ে ধুতি পরে রাজনীতি করেছেন। তবে ভাসানী শ্রমজীবীদের শোষণমুক্তি চাইতেন আন্তরিকভাবে। তার ছেলেবেলা, পারিবারিক পরিবেশ, যৌবনকালে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা তাকে কখনো ভুলতে দেয়নি যে তিনি তাদেরই একজন।

বাংলাদেশের কয়েকজন নেতার নামের সঙ্গে উপাধি হিসাবে কিছু শব্দ জড়িয়ে আছে। যেমন শেরে বাংলা, বঙ্গবন্ধু। মওলানা ভাসানীর ক্ষেত্রে ‘মজলুম জননেতা’ শুধু তার রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্যই নয়, বরং কৃষক-শ্রমিক-শ্রমজীবী মানুষের সামনে থেকে তাদের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে এ উপাধি তাকে দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে নয়; শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের ভেতর থেকে শুধু তিনি জননেতা নন, কোনো একসময় মজলুম জননেতার পরিচয়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ‘ভাসানী’ তার আসল নামের অংশ ছিল না। আসামের ‘ভাসান’ চর থেকে তার সংগ্রাম শুরুর সময় শব্দটা তার আসল নামের থেকে বড় হয়ে উঠেছিল।

তবে তার নামের যে শব্দটা তাকে সার্বজনীন করে তুলেছিল, সেটি মাদ্রাসা থেকে লেখাপড়া শেষ করা ব্যক্তিদের বেলায় প্রযোজ্য হলেও তিনি মাদ্রাসার লেখাপড়া শেষ না করেও পেয়েছেন। তবে তিনি কেন ‘মওলানা’, ‘মাওলানা’ নন? এর উত্তর হতে পারে, আসামে গিয়ে তিনি প্রথমে মক্তবে পাঠদান শুরু করেন। নামাজে ইমামতি করতেন। এ থেকেই মওলানা শব্দটি চালু হতে পারে। বিদেশি সাংবাদিকরা তাদের প্রতিবেদনে মওলানা শব্দটা ব্যবহার করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করতে গিয়ে তাকে ‘মি. মুলানা’ হিসাবে আখ্যায়িত করতেন। তবে আন্দোলন-সংগ্রামে পদ্ধতি হিসাবে অবরোধ, ধর্মঘট, বিক্ষোভ ব্যবহার করতে গিয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে তিনি ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’ নামে অপবাদের শিকার হয়েছেন। তিনি ‘জ্বালাও পোড়াও’য়ের আহ্বান দিয়ে মানুষকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতেন বলে তার এ দেশীয় রাজনৈতিক শত্রুরা অভিযোগ করত, যা মিথ্যা বচন ছাড়া আর কিছু ছিল না। মানুষের ভেতর সঞ্চিত দীর্ঘদিনের ক্ষোভ যখন বিস্ফোরিত হয়, তা কি শান্তিপূর্ণ অহিংস হতে পারে?

ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরোধিতা করতেন বলে একশ্রেণির মানুষ তাকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমর্থক বলে কুৎসা চালাত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যাতে সেখান থেকে তিনি বিদেশে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু ভারত বিভক্তির আগে আসামে তার রাজনীতির কথা মনে রেখে ভারত সরকার তার প্রতি লক্ষ রাখত যাতে তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়াতে না পারেন। ভারতে আশ্রয় নেওয়ার জন্য তিনি ভারত সরকারকে ধন্যবাদ দিয়েছেন, কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের নীতির তিনি বিরোধিতা করতে দেরি করেননি, বিশেষ করে ফারাক্কা বাঁধ ইস্যুতে। জীবন সায়াহ্নে এসে ফারাক্কা মিছিল করেছেন এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।

তিনি সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদবিরোধী নেতা ছিলেন। এ কারণে নিজে কমিউনিস্ট না হলেও কমিউনিস্টদের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি আওয়ামী লীগ গঠন করলেও রক্ষণশীল ও সাম্রাজ্যবাদের অনুগতদের সঙ্গে একই দলে থাকা অসম্ভব হওয়ায় প্রগতিশীল ও কমিউনিস্টদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কাগমারি সম্মেলনে ১৯৫৭ সালে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদ অনুগত বিদেশনীতির সমালোচনা। ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি করার ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যত কঠিন বাধা আসুক না কেন, আমি পাকিস্তানের জনগণের ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির জন্য সংগ্রাম করে যাব।’ কাগমারি আওয়ামী লীগের সম্মেলনে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্কের ফলে দলে ভাঙন তৈরি হয়েছিল। তিনি আওয়ামী লীগের কমিউনিস্ট ও বামপন্থি কর্মীদের নিয়ে ন্যাপ গঠন করেছিলেন।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতর আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ১৯৪৮ সালে ব্যবস্থাপক সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি পাট রপ্তানির টাকা থেকে পূর্ব বাংলাকে বঞ্চিত করার বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন। তার সেই বক্তৃতায় তিনি প্রশ্ন করেন, বাঙালিরা কি ‘গোলাম’ যে তাদের বঞ্চিত করা হবে? কাগমারি সম্মেলনে তিনি আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেছিলেন, প্রয়োজনে বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানাবে। তার এ উক্তির মধ্যে প্রয়োজনে বিচ্ছন্ন হওয়ার ইঙ্গিত ছিল।

মওলানা ভাসানী কমিউনিস্ট রাজনীতিকদের সমর্থনে কৃষক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন। শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন তখন জোরদার আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। মওলানার ডাকে বিভিন্ন কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতো এবং কৃষকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন হতো। ১৯৬৯-এর আন্দোলন এবং সবশেষে গণঅভ্যুত্থানের উৎপত্তি হয়েছিল নরসিংদীর হাতিরদিয়ায় হাট অবরোধ করে কৃষক সমিতির আন্দোলন থেকে। স্মর্তব্য যে, ’৬৯-এর আন্দোলনের যোদ্ধা ও প্রথম শহিদ আসাদ ছিলেন একজন কৃষক নেতা।

এদেশের কমিউনিস্ট নেতৃত্বের দুর্ভাগ্য যে, ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে চীন-সোভিয়েত বিভক্তি এবং চারু মজুমদারের শ্রেণিশত্রু খতমের ভ্রান্ত লাইন অনুসরণ করতে গিয়ে সাংগঠনিক বিভক্তি দেখা দেয় এবং ক্রমান্বয়ে তাদের আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে। মওলানা ভাসানীর সাথী কমিউনিস্টরা চারু মজুমদারের অনুসারী হতে গিয়ে একে একে তাকে বর্জন করে গোপন রাজনীতিকে একমাত্র পথ ধরে নিয়েছিলেন। এতে কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের আওতায় চলে যায়। অন্যদিকে ন্যাপ (ভাসানী) দলটি সাংগঠনিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকদের হাতে চলে যায়। মওলানা ভাসানী অনেকটা একা হয়ে পড়েন। বয়সের কারণেও তার চারপাশের লোকদের তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। তিনি ‘হক্কুল এবাদ মিশন’, ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’ ইত্যাদি নতুন সব কর্মসূচি স্থির করতে থাকেন। তা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে তার ডাকে অনুষ্ঠিত ফারাক্কা মিছিল দেশের স্বার্থে এক বড় পদক্ষেপ ছিল। এটি তার দেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত উদাহরণ বলা যায়। আজ মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

ড. আকমল হোসেন : সভাপতি, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদ

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT