মঙ্গলবার ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১০ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

প্রণোদনা প্যাকেজের পুরোটাই ঋণনির্ভর

প্রকাশিত : ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, ৭ এপ্রিল ২০২০ মঙ্গলবার ২৬২ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি দেশীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে গত রোববার পাঁচটি প্যাকেজে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যা জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। প্যাকেজ ঘোষণার পর গতকাল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবার মনেই একটা প্রশ্ন- সেটা হচ্ছে প্রণোদনার অর্থের সংস্থান কিভাবে হবে? বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডিও প্রণোদনা ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, প্রণোদনার অর্থের উৎস কোন কোন খাত থেকে আসবে সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, সরকার যে প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তা মূলত ঋণ। এসব ঋণে সরকার ৪ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। তবে বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে তারল্য সঙ্কট রয়েছে। এ অবস্থায় এত বেশি পরিমাণ ঋণ দেয়ার সক্ষমতা ব্যাংকগুলোর আছে কিনা সেটাও বিবেচনা করতে হবে সরকারকে।

একই বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো টাকাটাই আসবে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে। সরকারকে সুদ ভর্তুকি ছাড়া বাড়তি তেমন কোনো টাকা ব্যয় করতে হবে না। তবে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এই প্যাকেজ বাস্তবায়নে প্রস্তুত রয়েছে দেশের ব্যাংক খাত। তবে এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নগদ জমা সংরক্ষণের হার কিছুটা কমানোর দাবি জানান তারা।

এই প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, করোনার কারণে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটাতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। যা অর্থনীতিতে গতি স্লার করবে। তবে যে বিষয়টি উদ্বেগ সৃষ্টি করছে তা হচ্ছে এই প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে যে প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে তার পুরোটাই ঋণনির্ভর।

শিল্প, সেবা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় এসব খাতে যে অর্থায়নের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তার সবই ঋণ হিসেবে ব্যবসায়ীদের দেয়া হবে। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ হারে সুদ পাবে। যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক দেবে ঋণগ্রহীতা ও বাকি অর্ধেক ভর্তুকি হিসেবে দেবে সরকার। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় কমে গেছে আমানতের প্রবৃদ্ধি। ব্যাংকগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে তারল্য সঙ্কটের মধ্যে ঋণ দেবে কীভাবে?

তিনি আরো বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এই ঋণ বিতরণ কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংককে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। খেলাপি গ্রাহকরা যেন এই সুবিধা না পান সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

অর্থাৎ প্রকৃত সুবিধাভোগীরা যেন এই ঋণ পান সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। একই বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও শামস-উল-ইসলাম মানবকণ্ঠকে বলেন, সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সরকারি ব্যাংকগুলো তৈরি আছি।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে ব্যাংকগুলোতে খুব একটা তারল্য সঙ্কট নেই। তবে অদূর ভবিষ্যতে এই প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে গেলে হয়তো ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোর নগদ জমা অনুপাত (সিআরআর) কিছুটা কমিয়ে দিলে ব্যাংকগুলো সেই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারবে। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই বিষয়টি দেখবেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পুরো বিশ্ব বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। শিল্পের উৎপাদন, আমদানি-রফতানি, যাতায়াত সবই প্রায় বন্ধ। বাংলাদেশও এ পরিস্থিতির বাইরে নয়। দেশের প্রধান রফতনি খাত পোশাকসহ অন্যান্য খাতের রফতানি আয় কমেছে। বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল ও স্থগিত করায় আগামীতেও রফতানি কমার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতির ক্ষতি মোকাবিলায় এ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন চারটি প্যাকেজে ৬৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেন।

এর আগে তৈরি পোশাক খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন সরকারপ্রধান। সব মিলিয়ে পৌনে ৭৩ হাজার কোটি টাকা প্যাকেজের মধ্যে ৬৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার অর্থায়ন করবে দেশের ব্যাংকিং খাত। প্যাকেজের বাকি ৫ হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) বাজেট থেকে। পাশাপাশি প্যাকেজের ঋণের বিপরীতে সুদ বাবদ ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে সরকার ভর্তুকি হিসেবে দেবে ২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা এবং বাকি ২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করবেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে তা কেবল আপদকালের জন্য।

বিশেষ বিবেচনায় দেয়া এ প্যাকেজে সরকারের ব্যয় তেমন বাড়বে না। কারণ অধিকাংশ টাকাই আসবে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে। তাই বাজেট বাস্তবায়নে বা বাজেট ঘাটতিতে এটি কোনো চাপ ফেলবে না।

প্রধানমন্ত্রীর প্যাকেজ ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, এই প্যাকেজের আওতায় দেশের বড়, মাঝারি, ক্ষুদ্র্র শিল্প ও সেবাসহ মৎস্য, ডেইরি, পোলট্রি– খাতও তাদের চলতি মূলধন হিসেবে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। মূলত ৪-৬ মাসের জন্য এই ঋণ দেয়া হবে। ওই সময়ের মধ্যে প্যাকেজের অর্থ ফেরত দিয়ে নতুনভাবে আবার ঋণ নিতে পারবেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্যাকেজের ব্যবহারের নীতিমালা করবে, যেন সুষ্ঠুভাবে এটি বাস্তবায়ন করা যায়।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্যাকেজ ঘোষণার পর এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে এ অর্থের ব্যবহার, উপকারভোগীর শ্রেণি, প্যাকেজ থেকে ঋণ নেয়া ও পরিশোধের সময়সহ বিভিন্ন দিকনির্দেশনা নিয়ে নীতিমালা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি খুব শিগগিরই জারি করা হবে। এরপর প্যাকেজ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবে সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

প্রধানমন্ত্রীর নতুন করে ঘোষিত চার প্যাকেজের মধ্যে প্রথম প্যাকেজে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের জন্য ৩০ হাজার কোটি ঋণ সুবিধা দেয়া হবে। এ ঋণ সুবিধার সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। সুদের অর্ধেক সরকার ভর্তুকি দেবে। বাকি অর্ধেক দিতে হবে ঋণ গ্রহীতাদের। দ্বিতীয় প্যাকেজে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা দেয়া হবে। এর সুদ হারও হবে ৯ শতাংশ। তবে এ ক্ষেত্রে সরকার ৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। এ দুই প্যাকেজে ভর্তুকি বাবদ সরকারের খরচ বাড়বে কমই। কারণ এতে সব মিলিয়ে খরচ হবে মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা।

এই তিন হাজার কোটি টাকা বাজেট থেকে দেয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে পরিচালন ঋণ থেকে তা নেয়া হতে পারে। ভর্তুকি বাদে পুরো টাকাটাই আসবে ব্যাংকিং খাত থেকে। ঘোষিত চারটি প্যাকেজের বাকি দুটি মূলত তহবিল। এর একটি হলো এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ)। ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি সুবিধা বাড়াতে সরকার শুধু এর আকার বাড়িয়েছে। এতে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা যুক্ত হবে। এ টাকার পুরোটাই দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ ছাড়া প্রিশিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম নামে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ঋণ সুবিধা চালু করবে। এটিও বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা করবে। সাধারণত দেশে তফসিলি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো সব সময়ই ঋণ দিয়ে থাকে। যে চারটি নতুন প্যাকেজের ঘোষণা এসেছে তার সব সুবিধাই মূলত ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। আর এ ঋণ আসবে সেই ব্যাংকগুলো থেকেই। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে সরকারকে কিছুই করতে হচ্ছে না। যা করার ব্যাংকগুলোই করবে। ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক ভিত্তিতে এ ঋণ দেয়া হবে।

এ ছাড়া রফতানিমুখী শিল্পের জন্য আগেই ঘোষিত ৫ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে নীতিমালা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেসব প্রতিষ্ঠানের মোট উৎপাদিত পণ্যের ৮০ শতাংশ পণ্য রফতানি হয় সেসব প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য ঋণ নিতে পারবে। এক্ষেত্রে শিল্প মালিকরা ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিয়ে এ ঋণের সুবিধা নিতে পারবেন।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT