শনিবার ১১ জুলাই ২০২০, ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

নিজে অন্যায় না করে অন্যকে সৎপথের দিশা দেয়াই ছিল ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর আদর্শ

প্রকাশিত : ০১:০১ অপরাহ্ণ, ২৫ জুন ২০২০ বৃহস্পতিবার ৯ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

গত শনিবার রাতে অফিস থেকে ফেরার পর হঠাৎ একটি ফোনে কিছুটা থমকে গিয়েছিলাম। ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু আমার কাছে জানতে চাইলেন, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ নাকি ইন্তোল করেছেন। তার ভাগ্নের সূত্রে তিনি তথ্যটি আমায় জানিয়েছেন।

প্রথমে বিষয়টি গুজব মনে হলেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি গণমাধ্যমের সিনিয়র একজনকে কল দিলাম। তিনিও শুনে বললেন, হয়তো লোকজন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি গুলিয়ে ফেলছেন।

আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার আনোয়ার ভাইকে ফোন দিলাম। আনোয়ার ভাই কল রিসিভ করে বললেন, দোয়া করতে হবে, এতটুকুই। তখনই বুঝতে পেরেছি কোনো সমস্যা নিশ্চয় হয়েছে। এরপর উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি জানার চেষ্টা করে ২০ মিনিটের মধ্যে নিজেরা নিশ্চিত হলাম।

এর কিছুক্ষণ পর সরকারিভাবেও ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়। মুহূর্তে পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিশেষত ধর্মীয় অঙ্গন ও আলেম সমাজের জন্য আকস্মিক এমন খবর শোনাটা অনেকটা কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রীর মৃত্যুতে দেশের আলেম সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ এতটা ব্যথিত হয়েছে, দেশের ইতিহাসে এটি বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

শেখ মো. আবদুল্লাহ প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই দেশের আলেমদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে ইসলাম ও মুসলমানদের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই পেয়েছেন হজরত শামসুল হক ফরিদপুরীর সান্নিধ্য।

গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসায়ই শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল তার। মক্তবের প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে হিফজখানায়ও ভর্তি হয়েছিলেন। কয়েক পারা হিফজ করার পর চোখে সমস্যা হলে ছদর সাহেব হুজুরের পরামর্শেই তিনি স্কুলে চলে যান। জীবনের শুরু থেকে ছদর সাহেবের সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিল, হুজুরের মৃত্যু পর্যন্ত তার পরামর্শেই চলেছেন।

মনে পড়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার সপ্তাহেই যুগান্তরের জন্য শেখ আবদুল্লাহর একটি ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মিডিয়ায় সেটিই ছিল তার প্রথম সাক্ষাৎকার। যেখানে তিনি নিজের জীবনের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি কর্মপরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন। যুগান্তরে প্রকাশিত শেখ আবদুল্লাহর সেই সাক্ষাৎকারের ছবিটিই এরপর থেকে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হয়।

তিনি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হুট করেই পেয়ে যাননি। ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার আগে থেকেই শেখ আবদুল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ধর্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নের সফল রূপকারও তিনি।

বহুধাবিভক্ত কওমি আলেমদের ঐক্যবদ্ধ করে স্বীকৃতি আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টায়ই আলেমদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের দূরত্ব কমেছে। যা সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।

তাবলিগের চলমান সংকটেও তিনি রেখেছেন কাণ্ডারির ভূমিকা। তাবলিগ জামাতের বিবদমান দুপক্ষের দূরত্ব কমিয়ে আনতে তিনি পরিশ্রম করেছেন রাত-দিন।

তাবলিগের দুপক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে গত বছর বাংলাদেশের গর্ব বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, ইজতেমা হলেও দু’পক্ষই আলাদাভাবে করার ব্যাপারে ছিল অনড়; কিন্তু হঠাৎ করেই ঘুরে গেল পরিস্থিতি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিশ্ব ইজতেমার বিরোধ নিরসনে একটি সমাধানের পথ খুঁজে বের করেন।

তার মন্ত্রিত্বকালীন ২০১৯ সালে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে সুন্দর ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় হজ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তার প্রচেষ্টায় বিগত বছর হজের উড়োজাহাজ ভাড়া ১০ হাজার টাকা কমানো হয় এবং হজের কোটা বাড়ে ১০ হাজার।

সৌদি আরবের বিমানবন্দরে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের অপেক্ষার সময়ও কষ্ট কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সৌদি আরবের পরিবর্তে বাংলাদেশেই প্রি-এরাইভাল ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা হয়। মাত্র এক বছরের কম সময়ে হজ ব্যবস্থাপনায় শেখ আবদুল্লাহ যুগান্তকারী পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়েছেন।

দেশের ইতিহাসে প্রথম ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনিই বলতে পেরেছেন, ‘এ বছর হজযাত্রায় কোনো হাজীর চোখের পানি ফেলতে হয়নি’।

দায়িত্ব নেয়ার পর তার স্লোগান ছিল নিজে অন্যায় করব না, কাউকে করতে দেব না। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দুর্নীতি বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের জঞ্জাল প্রায় সাফ করে দিয়ে গেলেন।

তার মন্ত্রণালয়ের কোনো অনিয়ম জানালেই শুরু হতো অ্যাকশন। মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছেন। অন্য মন্ত্রীদের চেয়ে শেখ আবদুল্লাহ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম ছিলেন। অফিসিয়াল ফরমালিটির বাইরে গিয়ে সবাইকে মানিয়ে তিনি সুন্দর সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।

শেখ আবদুল্লাহর মতো মিশুক, উচ্ছল, সরল মনের মন্ত্রী দেশের মানুষ কমই দেখেছে। অসাধারণ ভদ্রতাবোধ ছিল তার, কিছুটা উচ্চস্বরে কথা বলতেন, কিন্তু তাতে গ্রামীণ সরলতা ও আন্তরিকতা থাকত।

দায়িত্ব পাওয়ার কিছুদিন পর সময় টিভিতে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি ইশকে রাসূল ও মারিফাত বিষয়ে সুন্দর আলোচনা করেছিলেন। সে কথায় মুগ্ধ হয়ে ইসলাম ও জীবন পাতার দরদি মালি হাফেজ আহমাদ উল্লাহ শুধু রাসূলের ভালোবাসার বিষয়ে তার একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার আদেশ দিয়েছিলেন।

বন্ধুবর আল ফাতাহ মামুনকে নিয়ে সেদিন গিয়েছিলাম সচিবালয়ে। হজের আগ মুহূর্তে নানা ব্যস্ততায় সেদিন বেশি সময় দিতে পারেননি। বের হওয়ার সময় হাত ধরে জানতে চাইলেন, হজ ব্যবস্থাপনা কেমন দেখছেন?

এত ছোট একজন মানুষের কাছে এভাবে নিজের কাজের মূল্যায়ন যিনি জানতে চান, তার আন্তরিকতা নিয়ে কতটুকু আর লেখা যায়?

করোনাকালে মসজিদে জামাত ও তারাবি চালু রাখার বিষয়েও তিনি ধর্মের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিতের পাশাপাশি আলেমদের পরামর্শও বিবেচনায় নিয়েছেন গুরুত্বের সঙ্গে।

সংকটকালীন এ সময়ে তিনি দেশবাসীকে আলেমদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। দেশের মসজিদ ও কওমি মাদ্রাসাগুলোর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে বলে প্রথমবারের মতো সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করেছেন।

দায়িত্ব নেয়ার পর যুগান্তরকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ আবদুল্লাহর কাছে হজসহ বিভিন্ন বিষয়ে নানা প্রশ্ন ছিল, সব প্রশ্নের উত্তর তিনি এক কথায় দিয়েছিলেন। বললেন সময় দেন, মাত্র তো শুরু। ইনশাআল্লাহ, আগামীতে পরিবর্তন দেখবেন।

দেশবাসী সে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা শুরুও করেছিল। দীর্ঘদিনের অবহেলিত ধর্ম মন্ত্রণালয়ে যখন পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তখনই আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি আখেরাতের সফর শুরু করলেন। আল্লাহর ইচ্ছার সামনে আসলেই আমাদের আত্মসমর্পণ করতে হয়। নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।

লেখক: তরুণ আলেম ও দৈনিক যুগান্তরের সহ-সম্পাদক

tanjilamir95@gmail.com

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT