শনিবার ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

টাকার জোগান বাড়াতে নজর রাখা হচ্ছে অর্থনীতির চাপ দু’মাসেই কমে যাবে

প্রকাশিত : ০৬:০৯ পূর্বাহ্ণ, ৫ আগস্ট ২০২২ শুক্রবার ৯ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

মার্চের তুলনায় সাড়ে ২৬ শতাংশ কমেছে ঋণপত্র খোলা, বিপরীতে বেড়েছে রফতানি ও প্রবাসী আয়। নিম্নমুখী মূল্যস্ফীতিও। আর এতে আগামী দুই মাসের মধ্যে অর্থনৈতিক চাপ অনেকাংশেই কেটে যাবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, অর্থ পাচার বন্ধসহ বাজারে টাকার জোগান বাড়াতে নজর রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারের সেকেন্ডারি মার্কেটে ‘বন্ড’ নেয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। শীঘ্রই সরকারী বন্ড লেনদেন চালু হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন গবর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

গত ১২ জুলাই দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই তার প্রথম সংবাদ সম্মেলন। মূলত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া পদক্ষেপগুলো জানাতে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন তিনি। দেশের অর্থনীতি চাপে আছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় চাপ ইমপোর্ট। মূল্যস্ফীতিও বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আগামী দু’-তিন মাসের মধ্যে ভাল অবস্থানে যাবে।’

করোনার সংক্রমণ থেকে বের হওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির যে সমস্যা দেখা দেয়, সেটি প্রকট করেছে ইউক্রেন যুদ্ধ। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে রাশিয়ার হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলোর পদক্ষেপে তেতে ওঠে জ্বালানির বাজারও। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার পর জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দরে উর্র্ধগতি, খাদ্যপণ্যের সরবরাহ কমে গিয়ে বিশ্বে তৈরি হয় নতুন সঙ্কট। এতে উন্নত, উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত সব দেশেই দেখা দেয় ব্যাপক প্রভাব, যার বাইরে নয় বাংলাদেশও। গত এক যুগের স্থিতিশীল ও উর্ধমুখী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ স্পষ্ট।

ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে কমছে রিজার্ভ, ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন মূল্যস্ফীতিতে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে গ্যাস আমদানি না করতে সরকারের সিদ্ধান্তে ফিরে এসেছে এক যুগ আগের লোডশেডিং। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপে আমদানি সীমিত করার পদক্ষেপের সুফলও মিলছে। আমদানি ব্যয় কমে আসছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে রেমিটেন্স ও রফতানি।

গবর্নর বলেন, বিশ্ব মন্দার জেরে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাপ কমাতে বাজারে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, ডলারসহ টাকার সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থনীতির ভিতটা গড়েছেন তিনি। আর এতেই আমদানিতে ঋণপত্র খোলা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ বিলিয়নে, বিপরীতে প্রবাসী আয় ও রফতানি বেড়ে সব মিলিয়ে ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। তিনি বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে কমবে মূল্যস্ফীতিও। কেননা অর্থ পাচার বন্ধসহ বাজারে টাকার জোগান বাড়াতে নজর রেখেছেন তিনি।

গবর্নরের কাছে প্রশ্ন ছিল আমদানির সময় ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না। উত্তরে তিনি বলেন, ‘ট্রেড ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে টাকা বের হয়ে যাচ্ছে- এমন প্রচারণা আলোচনায় আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে সঠিক কোন তথ্য আমাদের বা কারও কাছে নেই।’ তিনি জানান, ৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে আপলোড করতে হয়।

এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দল এটা পর্যবেক্ষণ করছে। কোন ঋণপত্র সন্দেহজনক মনে হলে সেটা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।’ অন্য এক প্রশ্নে গবর্নর বলেন, তিনি মনে করেন ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদে ঋণ বিতরণ খেলাপী ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ।

র‌্যাঙ্কিং পর্যালোচনা করে ১০ দুর্বল ব্যাংককে ‘সবল করতে’ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নতুন গবর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। গবর্নর বলেন, ‘কোন ব্যাংক বন্ধ হোক সেটা আমরা চাই না। এ জন্য র‌্যাঙ্কিং পর্যালোচনা করে ১০টি ব্যাংককে আলাদা করেছি। আমরা চাই তারা দুর্বল থেকে সবল হোক, ব্যবসা করুক। ‘খেলাপী ঋণ বেশি, মূলধন ঘাটতি, ঋণ-আমানত অনুপাত এবং প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে ১০টি দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’

ব্যাংকগুলোর নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, ‘আমি দুর্বল ব্যাংকগুলোর নাম বলতে চাই না। তবে পত্রপত্রিকায় ইতোমধ্যে তাদের নাম এসেছে। আমাদের লক্ষ্য, ব্যাংকগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা। ‘ব্যাংকের সুশাসনের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল। দুর্বল ১০টি ব্যাংকের মধ্যে প্রথমটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজে পর্ষদ কোন হস্তক্ষেপ করবে না। এখানে চাপ বলে কিছু নেই। আইনের মধ্যে থেকে কাজ করছে কি না সেটাই প্রধান।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়ে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিতে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ ও পুনর্গঠনসংক্রান্ত মাস্টার সার্কুলার জারি হয়েছে। এ সার্কুলারের বর্ণিত শর্ত মোতাবেক ব্যাংকগুলো নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে, যা আগে অনেকটা অস্বচ্ছ এবং অসমভাবে করা হতো। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করতে চারটি চলক বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

শ্রেণীকৃত ঋণের মাত্রা, মূলধন পর্যাপ্ততা, ঋণ-আমানত অনুপাত এবং প্রভিশনিংয়ের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ১০টি দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ওয়ান-টু-ওয়ান’ আলোচনা শুরু করছে। বিশেষ এ উদ্যোগে ব্যাংকগুলো তিন বছর মেয়াদি বিজনেস প্ল্যান দেবে, যার ক্রমঅগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা।

গবর্নর মনে করেন দেশের পুঁজিবাজার যত দূর যাওয়ার কথা ছিল, সেটা পারেনি। আর এক্ষেত্রে পুঁজিবাজার উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেবেন তিনি। বৃস্পতিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে এমন একটি সার্কুলার জারি হয়, যা গত এক যুগ ধরে দাবি করে আসছিলেন পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের যে বিনিয়োগসীমা গণনা করা হয়, সেটির হিসাব করা হবে শেয়ারের ক্রয়মূল্যে।

এতদিন তা শেয়ারের বাজারমূল্য অথবা ক্রয়মূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেটির ভিত্তিতে এই বিনিয়োগসীমা হিসাব করা হতো। এই নীতিতে এক্সপোজার লিমিট হিসাব করায় বাজারে বিক্রয় চাপ দেখা দিত। কোন ব্যাংক তার বিনিয়োগসীমার মধ্যে শেয়ার কিনলে সেটির দর বেড়ে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে গেলেই তা বিক্রি করে দিতে হয়। এতে বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়। আর ব্যাংক যেহেতু বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে তাই বিক্রির চাপটাও বেশি থাকে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগকারীর প্রাধান্য বেশি। ব্যাংকের বিক্রয় চাপ তারা সামাল দিতে পারে না।

গবর্নর বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বাংলাদেশ সিকিউরিটিস এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ভাল কাজ করছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যেসব নীতি সহায়তা দেয়া প্রয়োজন, সেটা আমরা দিয়ে যাব।

পুঁজিবাজারে ব্যাংকের এক্সপোজারের সংজ্ঞা নিয়ে গত ১০/১২ বছর ধরে যে সমস্যা চলছে সেটা এখন সমাধান হয়ে গেছে।‘ বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের মতো বন্ড মার্কেটকে চাঙ্গা করার আগ্রহের কথাও বলেন গবর্নর রউফ তালুকদার।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের দুটো দিক আছে। একটা হলো ইক্যুইটি সাইড, আর একটা হলো ডেট সাইড। ইক্যুইটি সাইডকে আমরা পুঁজিবাজার বলি, এখানে আমরা সবাই কাজ করি। এটাই আমাদের বিনিয়োগের বড় জায়গা। কিন্তু যেটা হলো ডেট সাইড সেখানে বন্ড মার্কেটটা সেভাবে উন্নত হয়নি।

আমি গবর্নর হওয়ার পরে বিএসইসি চেয়ারম্যান আমার সঙ্গে দেখা করতে আসলে তাতে আমি বলেছি বন্ড মার্কেটটাকে কেন আপনারা শক্তিশালী করছেন না? আমি অর্থ সচিব থাকার সময়েও তাকে এই প্রশ্ন করেছিলাম। ‘আমাদের দেশে বন্ড মার্কেট একবারেই অনুপস্থিত। কিন্তু এই বন্ড মার্কেটটা যদি কার্যকর হয়, বর্তমানে সরকারী বন্ডগুলো সেকেন্ডারি মার্কেটে নিয়ে যাচ্ছি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটা ফ্ল্যাটফর্ম তৈরি করে ফেলেছে।

ইতোমধ্যে এর সব প্রক্রিয়া শেষ। খুব শীঘ্রই এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। ‘তখন সরকারী বন্ডগুলো সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রি হবে। শেয়ারের যেহেতু সেকেন্ডারি মার্কেট নেই, এই বন্ডের সেকেন্ডারি মার্কেটটাকে প্রাণবন্ত করতে হবে এবং ভাল ভাল বন্ড নিয়ে আসতে হবে। বন্ডগুলো যদি সম্পদশালী হয় এবং গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে মানষের বন্ডের প্রতি আস্থা তৈরি হবে।’ গবর্নর মনে করেন বন্ড মার্কেট বড় হলে ব্যাংকের খেলাপী ঋণের সমস্যারও সমাধান হবে। তিনি মনে করেন, ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে ঋণ বিতরণ করে বলেই খেলাপী তৈরি হয়।

দেশে বন্ড মার্কেট না থাকায় ব্যাংকগুলোকে বাধ্য হয়ে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ বিতরণ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী বন্ড মার্কেট তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের সমস্যা দূর হবে। বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী ঋণ বন্ড মার্কেট থেকে তুলবে। আর ব্যাংকগুলো তখন কেবল স্বল্পমেয়াদী ঋণ বিতরণ করতে পারবে। এটা যদি করতে পারে তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ব্যাংকের খেলাপী ঋণও কমে আসবে।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর আহমেদ জামাল, কাজী ছাইদুর রহমান, আবু ফরাহ মোঃ নাছের, এ কে এম সাজেদুর রহমান খান, বিএফআইইউ প্রধান মাসুদ বিশ্বাস, নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোঃ সিরাজুল ইসলাম ও সহকারী মুখপাত্র জিএম আবুল কালাম আজাদসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT