রবিবার ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ৩রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

‘চাকরি হারানোর ভয়ে ৩ ঘণ্টার রাস্তা ৪০০০ টাকা খরচ করে আসছি’

প্রকাশিত : ০৭:৪২ পূর্বাহ্ণ, ৬ এপ্রিল ২০২০ সোমবার ২৩১ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

বাংলাদেশে সরকার নির্দেশিত সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হলেও, তৈরি পোশাক কারখানা খোলার নির্ধারিত তারিখ ছিল রোববার পাঁচই এপ্রিল।

ফলে সারাদেশে ‘কার্যত লক-ডাউন’ পরিস্থিতির কারণে গণ-পরিবহন বন্ধ থাকার পরেও শনিবার হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক কর্মস্থলে ফিরেছেন।

কিন্তু শনিবার রাতে পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ ১১ই এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে শ্রমিকদের বড় অংশই এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জেনেছেন আজ কারখানায় গিয়ে। ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে এ নিয়ে দেখা গেছে তীব্র হতাশা।

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের সাথি সরকার গাজীপুরের একটি রপ্তানি-মুখী পোশাক কারখানায় কাজ করেন।

সরকারের দেয়া ১০ দিনের সাধারণ ছুটিতে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন।

তবে এরই মধ্যে সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়লেও, যেহেতু শনিবার পর্যন্ত পোশাক কারখানা বন্ধের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি, সে কারণে ধারদেনা করে শনিবার দুপুরে কর্মস্থলে ফিরে এসেছেন সাথি।

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন কত হেনস্থার শিকার হয়ে কর্মস্থলে ফিরেছেন তিনি।

বাড়ি থেকে হাইটা আসছি অনেক রাস্তা, তারপর পিকআপে আসছি কয়েক কিলো রাস্তা।

তারপর হুন্ডায় (মোটরসাইকেল) আইছি ময়মনসিংহ পর্যন্ত। সেইখানে রাইতে থাইকা সকালে কিছুদূর অটো-রিকসা ও সিএনজি, এবং পরে আবার পিকআপে চইড়া আসছি আমরা।

তিন ঘণ্টার রাস্তা, দুইদিন ধইরা আসছি। খরচ হইছে একেকজনের জন্যে চার হাজার টাকার মত। এত কষ্ট কইরা আসছি কারণ খোলার দিন না থাকলে যদি চাকরি না থাকে!

আবার এখন তো বেতনের টাইম, যদি বেতন না দেয়, সেই ভয়ে।”

এত কষ্ট করে কর্মস্থলে পৌঁছে শনিবার রাত পর্যন্তও কিছু জানতে পারেননি তিনি।

রোববার সকালে কারখানায় গিয়ে জানতে পারেন আগামী ১১ই এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ থাকবে।

সাথির মতই কারখানার প্রধান ফটকে টাঙ্গানো নোটিস দেখেই ছুটি বাড়ার বিষয়ে জানতে পেরেছেন টঙ্গীর পোশাককর্মী চুমকি সুলতানা।

এখন কবে কারখানা খুলবে আর কবে বেতন পাবেন তা নিয়ে রীতিমত দুর্ভাবনায় পড়েছেন চুমকি

গেটে নোটিস লেইখা দিছে যে বন্ধ, কিন্তু বেতন কবে দিবে সেই বিষয়ে কিছু বলে নাই। ফ্যাক্টরির গেটে বড় সাহেবরাও (কর্মকর্তা) ছিলেন, তারাও কিছু স্পষ্ট করলেন না। এখন খামু কী, চলমু কেমনে, সেই চিন্তায় আছি।

“বাড়িওয়ালারা এখনও কিছু বলতাসে না, কিন্তু দোকানদাররা দশ টাকার জিনিসও বাকি দিতে চাইতাসে না। হেরা মনে করতাসে বেতন পাইনা, বাকি নিয়া পালাইয়া যামু, তাই বাকি দিতাছে না।”

কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে কেন দেরি?

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে গত ২৬শে মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি চলছে।

এর মধ্যে বাস-ট্রেন-লঞ্চসহ সব ধরণের গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে।

নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ এবং সংবাদপত্র ছাড়া সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরণের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

পোশাক মালিকেরা বলছেন, যেহেতু কারখানা বন্ধ করার জন্য সরকারের নির্দেশ ছিল না, সেজন্যই অনেক কারখানা খোলা রাখা হয়েছিল।

এমনকি যথাসময়ে অর্থাৎ প্রথম দফায় ঘোষিত সাধারণ ছুটির মেয়াদ শেষে রোববার কারখানা খোলা রাখার ভাবনাই ছিল মালিকদের।

কিন্তু একদিকে গণপরিবহন বন্ধের কারণে কর্মস্থলে ফিরতে শ্রমিকদের ভোগান্তি এবং অন্যদিকে সামাজিক দূরত্বের নিয়ম না মেনে হাজার হাজার কর্মী দলবেঁধে ফেরত আসায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ার আশংকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে শনিবার সন্ধ্যার পরে কারখানা বন্ধের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বিজিএমইএ।

বিজিএমইএর একজন সহ-সভাপতি আরশাদ জামাল দিপু বলেছেন, সরকারের নির্দেশনার বাইরে কিছু করেননি তারা।

কিছু কারখানা খোলা ছিল, এদের মধ্যে কেউ পিপিই এবং মাস্কের মত পণ্য বানাচ্ছিল।

এর বাইরে কিছু কারখানায় যেমন কোন অর্ডারের ৮৫ শতাংশ বা ৯০ শতাংশ কাজ হয়ে গেছে, দুয়েকদিন কাজ করলেই শেষ হবে অর্ডারের কাজ সেসব কারখানা সীমিত পরিসরে খোলা ছিল।

তিনি বলছেন, বিজিএমইএর এখতিয়ার নেই কারখানা বন্ধ করার এবং সরকারের কারখানা খোলা রাখা সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনেই কারখানা খোলা রাখা হয়েছিল।

তিনি বলছেন, সরকারের নির্দেশনার বাইরে কিছু করা হয়নি।

কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত সরকারেরই ছিল, আমি দোষারোপের জন্য বলছি না, কিন্তু এটাই বাস্তবতা, কারখানা বন্ধ করার ‘অ্যাডভাইস’টাও এসেছে সরকারের কাছ থেকেই। সে অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজিএমইএ।

সরকার কী বলছে?
এদিকে, পোশাক কারখানা খোলা বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে কালক্ষেপণের এবং সমন্বয়হীনতার অভিযোগ ওঠার পর, মালিক বা সরকার কেউই এককভাবে এর দায় নিচ্ছে না।

সরকার বলছে এই বিপুল পরিমাণ শ্রমিক যে ঢাকা, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে বাইরে গেছে সে সম্পর্কে ধারণা করতে পারেননি তারা।

যে কারণে শনিবার বিভিন্ন সরকারী সংস্থা এবং গণমাধ্যমের রিপোর্টের পরই আঁচ পাওয়া যায় যে বিপুল পরিমাণ মানুষ ফিরতে শুরু করেছে কর্মস্থলে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী বলছিলেন, ওই প্রেক্ষাপটে পোশাক কারখানা বন্ধের ব্যাপারে শনিবার সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।

আমাদের কাছে রিপোর্ট ছিল যে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন শতাংশ শ্রমিক শহরের বাইরে চলে গেছে।

কারণ সে রকমই নির্দেশনা দেয়া ছিল যে তারা যেন যেখানে আছে সেখানেই থাকে, মানে কর্মস্থলের কাছেই যেখানে তারা বাস করছে।

কিন্তু শনিবার সকাল থেকে বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরা ফোন পেতে শুরু করি।

আমাদের জানানো হয় মিছিলের মত শ্রমিকেরা আসছে, তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না। তারা বলছে না পৌঁছালে তাদের চাকরি চলে যাবে, বা বেতন পাবে না। তখন আমাদের নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

তবে মন্ত্রী সমন্বয়হীনতার অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করে বলেছেন, পোশাক কারখানার শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT