শনিবার ৩১ জুলাই ২০২১, ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

করোনায় লণ্ডভণ্ড শিল্প খাত ঋণের সুদ মওকুফের দাবি

প্রকাশিত : ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ, ২৬ এপ্রিল ২০২০ রবিবার ২৬৮ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

করোনার আঘাতে লণ্ডভণ্ড দেশের বেসরকারি খাত। ঘুরছে না কলকারখানার চাকা। নেই উৎপাদন। চাহিদা নেই, তাই আসছে না শিল্পের কাঁচামাল। অর্ডার বাতিল, তাই হচ্ছে না রপ্তানি। গাড়ির চাকা অচল, তাই থমকে আছে পণ্য পরিবহন। লকডাউনে নিষ্প্রাণ ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজার, বন্দর, বাণিজ্যকেন্দ্র সব কিছু। সংগত কারণেই বেসরকারি শিল্প-সেবার মালিক, উদ্যোক্তাদের আয় নেই। উল্টো বাড়ছে লোকসান। স্থাপনার ভাড়া, বিভিন্ন বিল ও চার্জ, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, কর্মচারীর বেতনসহ দীর্ঘ হচ্ছে খরচের খাতা। নানা সমস্যা চেপে ধরছে উদ্যোক্তাদের। এখন তাঁদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাংক ঋণ। ব্যবসা না চললেও মাথার ওপর ঝুলছে ঋণের কিস্তি।

উদ্যোক্তারা জানান, শুধু স্বল্প সুদে প্রণোদনা নয়; আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান ঋণের সুদ মওকুফের পাশাপাশি ওই সময় পর্যন্ত স্থগিত করতে হবে কিস্তি। অন্যথায় মরণ ছাড়া গতি নেই তাঁদের। না পারবেন কারখানা চালু করতে, না দিতে পারবেন ঋণের কিস্তি। বেকার হবে লাখ লাখ কর্মী।

নিজের বিদ্যমান সম্পদের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। স্বাভাবিক সময়ে ব্যবসা সহায়ক ঋণের সুদ পরিশোধে তেমন বেগ পেতে হয়নি তাঁদের। করোনার কারণে এখন সব কিছুই উলটপালট। সংকটে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সব শেষ অর্থনৈতিক জরিপ বলছে, দেশে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭৮ লাখ। এ সংখ্যা গেল এক যুগে ব্যাপক হারে বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন-আইএফসির সব শেষ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার মূল শক্তিই বেসরকারি খাত। গেল কয়েক দশকে এ খাতের প্রবৃদ্ধি অপ্রতিরোধ্য। সংস্থাটি বলছে, ১৯৮৫ সালে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ছিল ১০ শতাংশ। ২০১৮ সালে এই খাতের বিনিয়োগ পৌঁছায় ২৩ শতাংশে। আর বর্তমানে বিনিয়োগের তিন-চতুর্থাংশ অবদানই এই খাতটির।

সংস্থাটির গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশের উৎপাদনশীল কারখানার অংশীদারির দিক থেকে ৪১ শতাংশ এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প), ৩৭ শতাংশ ক্ষুদ্র, ১৪ শতাংশ মাঝারি ও ৮ শতাংশ বৃহৎ শিল্প। কর্মসংস্থানের দিক থেকে সবার ওপরে বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। কর্মসংস্থান প্রায় ২৯ লাখ ৬৫ হাজার। মাঝারি শিল্পে কর্মী প্রায় ১০ লাখ ৪২ হাজার। আর সংখ্যার দিক থেকে দেশে শীর্ষে রয়েছে টেক্সটাইল মিল। সংখ্যা ১০ হাজার ৯৮৩টি, এর পরই খাদ্য ও খাদ্যজাত শিল্প আট হাজার ৪৪১টি এবং পোশাক কারখানা ছয় হাজার ৯৮৪টি। এসব শিল্পে বড় বিনিয়োগ এবং মুনাফায়ও এগুলো এগিয়ে।

তবে অন্য সব খাতের মতো করোনার আঘাতে এ রকম ক্রম উদীয়মান এ খাতটিও এখন চরম ক্ষতির মুখে। বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক সংকট অন্তত আগামী এক বছর থাকবে। দ্রুতই কাটবে না এই সংকট। দীর্ঘমেয়াদেও বড় প্রভাব পড়বে। এই সংকটে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জের মধ্যে ব্যাংক ঋণের সুদ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা যেখানে চলমান পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে ঋণ ও সুদ পরিশোধ বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

গত মার্চে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। ৮ মার্চ প্রথম আক্রান্ত শনাক্তের পর করোনার বিস্তার ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, ছোট-বড় শিল্প-কারখানার কর্মকাণ্ড এখন স্থবির। দেশের উদ্যোক্তারা সাধারণত ব্যাংক ও পুঁজিবাজার থেকে মূলধন নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। তবে সহজবোধ্য ও সুবিধাজনক হওয়ায় ব্যাংক ঋণেই উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বেশি। ১০০ টাকা ঋণ নিয়ে ১২-১৫ টাকা পর্যন্ত সুদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন উদ্যোক্তারা। স্বাভাবিক সময় এ উচ্চ সুদহার নিয়ে অস্বস্তিতে থাকা ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল শিল্প ঋণ এক অঙ্কে নামিয়ে আনার। দীর্ঘ চেষ্টার পর এপ্রিল থেকে এই সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর হয়েছে। তবে এই সময় দেশের শিল্পখাত করোনার আঘাতে বেসামাল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শেষ তথ্যানুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ব্যাংকের ঋণের স্থিতি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৮৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ দেশের শিল্পোদ্যোক্তারের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর ঋণ রয়েছে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৪.৮০ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৯.১৩ শতাংশ।

সূত্র জানায়, করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবেলায় সরকার প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। স্বল্প সুদে ব্যবসায়ীদের ঋণের ব্যবস্থা করেছে। সংকট কাটাতে নানামুখী নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী জুন পর্যন্ত কোনো উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করতে না পারলেও শ্রেণিমান বা খেলাপির তালিকায় পড়বেন না। পাশাপাশি রপ্তানির অর্থ দেশে আনা ও আমদানি দায় পরিশোধের মেয়াদ ৬০ দিন করে বাড়ানো হয়েছে। ১৮০ দিন বাড়ানো হয়েছে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আওতায় স্বল্পমেয়াদি সাপ্লায়ার্স ও বায়ার্স ক্রেডিটের মেয়াদ। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে ৯০ দিন।

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, করোনার কারণে শিল্প খাতে বিপর্যয় ঠেকাতে সুদও মওকুফ করতে হবে। কারখানা বন্ধ থাকায় শিল্প মালিকদের আয়ের পথ বন্ধ। বরং কোনো কার্যক্রম না থাকলেও বন্ধের সময় শ্রমিকের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানামুখী শঙ্কা। কত দিন এই পরিস্থিতি চলবে সে বিষয়েও বলা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে, করোনার কারণে শিল্প খাতেও ভর্তুকি দিতে হবে। নতুবা শিল্প খাতে অস্থিরতা কমানো সম্ভব হবে না। দেশের কর্মসংস্থানে বড় সংকট দেখা দেবে।

তাঁরা জানান, বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যাংক থেকে ঋণনির্ভর। কল-কারখানার চাকা না ঘুরলেও ব্যাংকের সুদ চার্জ হচ্ছে ঠিকই। করোনা দুর্যোগ সংকটকালে ঋণের সুদ চার্জ স্থগিত রাখা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমাও ছয় মাস বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার কারণে কারখানাগুলোর সবই প্রায় বন্ধ। কিন্তু কারখানার উৎপাদন না থাকলেও কিছু অপারেশনাল এক্সপেন্স (পরিচালন ব্যয়) রয়েছে। কারখানার আয় চলমান না থাকলে যে কারো পক্ষে এটা দেওয়া কঠিন। তারপর আছে ব্যাংক ঋণ। মেয়াদি ঋণের পাশাপাশি চলতি মূলধন ঋণ রয়েছে। এগুলোতে প্রতি মাসেই সুদ চার্জ হচ্ছে। করোনার ক্ষতি পোষাতে শুধু প্রণোদনা প্যাকেজে হবে না, আরো নীতি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে সংকটকালে ঋণের সুদ চার্জ স্থগিত রাখার নির্দেশনা দিতে পারে সরকার।’

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘করোনার কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রণোদনা প্যাকেজের বাইরে এখন ব্যাংক থেকে বিনা সুদের ঋণ দরকার। আগের ঋণের সুদও স্থগিত রাখা উচিত। ঋণের কিস্তি স্থগিত রাখার সময়সীমাও বাড়াতে হবে।’

বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আগামী এক বছরের জন্য ঋণের কিস্তি এবং সুদ মওকুফ করে সরকারকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া উচিত। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাসের ঋণের কিস্তি পরিশোধের শর্ত শিথিল করে যে সার্কুলার জারি করেছে, তাতে সুদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এতে কিস্তি দেওয়া থেকে ছাড় পেলেও চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে চেপে বসবে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।’ তাই সংকটকালীন সুদ স্থগিত রাখার দাবি জানান তিনি।

করোনার কারণে দেশের শিল্প খাত রক্ষায় প্রায় লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে বড় শিল্প ও সেবা ঋণ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, কৃষি খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা এবং নিম্ন আয়ের পেশাজীবীদের জন্য তিন হাজার কোটি টাকার তহবিল রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বেশ কিছু নীতি সহায়তার ঘোষণা এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে এখন ব্যবসায়ীদের কম সুদের ঋণ খুব প্রয়োজন।’ পাশাপাশি করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আরো নীতি-সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT