বুধবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

অভিযানে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ হয় না কেন

প্রকাশিত : ০৯:২৫ পূর্বাহ্ণ, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ শনিবার ১৬ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :

কয়েক সপ্তাহ আগে কুষ্টিয়া জেলার কয়েকটি থানার অধীনে যেসব অবৈধ ইটভাটা আছে, সেসব উচ্ছেদে অভিযান চালায় পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রতিবছরই কমবেশি এ রকম অভিযান চলে দেশজুড়ে; এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। যে এলাকায় যেদিন অভিযান শেষ করে তারা চলে যায়, তার পরপরই অথবা দু-একদিন পরই ওইসব ইটভাটা আগের মতোই আবার বহাল তবিয়তে কার্যক্রম শুরু করে। সরকারি এ অভিযানে পুলিশ, আনসার, র‌্যাব, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কোনো কোনো ইটভাটায় ফায়ার সার্ভিস পানি ঢেলে ভাটার আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। আবার কোথাও কোথাও ইটভাটার চিমনি ও বাউন্ডারি ক্লিন বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ অভিযান চালাতে সরকারের কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয় এবং অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এতে অংশগ্রহণ করতে হয়। এর ফলে প্রতিদিন যেসব শ্রমিক ইটভাটায় দৈনন্দিন পরিশ্রম করে ন্যূনতম পারিশ্রমিক নিয়ে সংসার চালায়, তাদের সেদিনের সেই আয় বন্ধ হয়ে যায়।

প্রশ্ন হলো, এসব অভিযান চালিয়ে বাস্তবিক অর্থে কোন্ পক্ষ লাভবান হয়-সরকারপক্ষ, নাকি অবৈধ ইটভাটার মালিকপক্ষ? এটা নিশ্চিত যে, উভয়পক্ষেরই অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়। সরকারি এসব অভিযানে শুধু যে ইটভাটায় উচ্ছেদই চালানো হয় তা নয়; কোনো কোনো বছর অবৈধ ইটভাটা মালিকদের প্রকারভেদে কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। আর্থিক জরিমানা অথবা উচ্ছেদ যাই হোক না কেন, সার্বিক অর্থে এ রকম অভিযানের মূল উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য কি ধারাবাহিক রুটিন অনুযায়ী লাখ লাখ টাকা ও জনবল ব্যয় করে শুধুই অভিযান চালিয়ে যাওয়া, নাকি প্রকৃত অর্থেই লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ইটভাটার মাধ্যমে পরিবেশের যে মারাত্মক ও ব্যাপক ক্ষতি হয়, সেটা বন্ধ করা?

যদি ধরে নেওয়া হয় এটা নিয়মিত ধারাবাহিক অভিযান, তাহলে আলোচনা দীর্ঘায়িত করার দরকার আছে বলে মনে করি না। কিন্তু উদ্দেশ্যটা যদি হয় ইটভাটা দিয়ে পরিবেশের যে মারাত্মক ও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে সেটা রোধ করা, তাহলে কিছু আলোচনা করা যেতে পারে। দেশের প্রতিটি জেলা, থানা ও ইউনিয়নে কতটি বৈধ ও অবৈধ ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে, তার সঠিক সংখ্যা জানা গেলে যারা পরিবেশবিদ আছেন, যারা পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করেন, তারা হয়তো সহজেই হিসাব কষে বলে দিতে পারবেন ইটভাটাগুলো দিয়ে পরিবেশের কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর আইনে পরিষ্কার বলা আছে কোনো ব্যক্তি যদি অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা করে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া, তাহলে তাদের কী কী দণ্ড ও জরিমানা দিতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশনীতি ও আইনে দেখা যায়-ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০১৯-এর ধারা ৪-এ উল্লেখ আছে, জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি ইটভাটা স্থাপন ও ইট প্রস্তুত করতে পারবে না। ধারা ১৪-তে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ধারা ৪ বা ৪ক লঙ্ঘন করে ইট প্রস্তুত বা ভাটা স্থাপন, পরিচালনা বা চালু রাখেন, তাহলে তিনি অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এসব অভিযান দিয়ে সত্যিকার অর্থেই যদি সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা যেত, তাহলে পরিবেশের উপকার হতো। কিন্তু আসলে তো সেটা হচ্ছে না। বরং কী হয়েছে সে পরিসংখ্যান যদি বিভিন্ন দিক থেকে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। বিভিন্ন দিক মানে প্রশাসনের দিক, অবৈধ ইটভাটা পরিচালনাকারী ও ইট ক্রয়কারী বা ক্রেতার দিক।

প্রথমে প্রশাসনের দিকগুলো উল্লেখ করছি। ১. এসব অভিযান পরিচালনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, আনসার বাহিনী, কোথাও কোথাও র‌্যাব এবং উচ্চপর্যায়ের সরকারি অফিসারদের অংশগ্রহণ থাকতে হয়। ২. সরকারি বড় বড় কর্মকর্তাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বন্ধ করে এসব অভিযানে অংশগ্রহণ করতে হয়। ৩. এসব অভিযান চলে মূলত জেলা সদর ও উপজেলা থেকে অনেক দূর-দূরান্তের গ্রামগুলোতে এবং অভিযানগুলো চলে মূলত শীতকালে, যখন দিনটা মূলত ছোট থাকে। ৪. অভিযান শেষ করে ফিরে আসতে নিশ্চিত সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায় এবং দুপুরের খাবারেরও ব্যাঘাত ঘটে। দিনভর দূর-দূরান্তের এসব অভিযানে অক্লান্ত পরিশ্রমে শারীরিক দুর্বলতার কারণে পরদিন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অন্য সদস্যদের ছুটিও নেওয়া লাগতে পারে। ৫. এসব অভিযানে লোকবল, জ্বালানি তেলসহ যানবহন, লাখ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি, বুলডোজার, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ব্যবহার করতে হয় এবং অবশ্যই এসবের একটা আর্থিক মূল্য আছে। সরকারি এ অর্থ সাধারণ জনগণের ভ্যাট, ট্যাক্স বা খেটে খাওয়া মানুষের টাকা। ৬. কোনো কোনো বছর অবৈধ ইটভাটা মালিকদের লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হয়, যে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়ে সরকারের কিছু উপার্জন হয়। আবার কোনো কোনো বছর জরিমানা না করে শুধু বুলডোজারের ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়, যা দু-একদিন পরই মালিকরা আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে এনে তাদের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার যে লাখ লাখ টাকা ও জনবল ব্যয় করে, তা থেকে আসলে অর্জন কী বা কতটুকু? অবৈধ ইটভাটা দিয়ে পরিবেশের যে মারাত্মক ক্ষতি করা হচ্ছে, তা কি অভিযানের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে; নাকি জ্বালানি হিসাবে যে গাছ কাটা হতো, সে গাছ কাটা স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে?

এবার অবৈধ ইটভাটা মালিকদের নিয়ে কিছু কথা। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাক বা না পাক, এসব বৈধ বা অবৈধ ইটভাটা গড়ে তুলতে তাদের একটা বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে হয়, যেটা সরকারি অভিযানে ভাঙা পড়ে। শত শত লোক পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করে ইটভাটাগুলো থেকে। যেদিন সরকারি অভিযান চলে, সেদিন থেকে পরবর্তী বেশ কয়েকদিন কিছু শ্রমিকের কাজ বন্ধ থাকে। কাজ বন্ধ থাকা মানেই উপার্জন বন্ধ আর উপার্জন বন্ধ মানেই শ্রমিকদের বউ-বাচ্চা, ছেলেমেয়েদের নিয়ে না খেয়ে থাকা। বাস্তবে এমন কোনো উদাহরণ নেই যে, সরকারি অভিযান চালানোর পর কোনো ইটভাটা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে; বরং দেখা যায়, অভিযান চালানোর কয়েক দিনের মধ্যেই ইটভাটার মালিকরা আবার আগের অবস্থানে ফিরে গিয়ে তাদের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। সরকারি অভিযানে ফায়ার সার্ভিস ও বুলডোজার দিয়ে যেখানে ইট পোড়ানো বন্ধ করা হয়, সেখানে ঠিক আগের অবস্থানে ফিরে যেতে ইটভাটা মালিকদের তিন-চারগুণ বেশি জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করতে হয়।

আমাদের জানা নেই, অভিযান চালানোর পরপরই ওইসব অবৈধ ইটভাটা মালিক পরিবেশ অধিদপ্তরে এসে অনুমতি বা ছাড়পত্র নিয়ে যায় কিনা। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবছর সরকারি এ রকম সাঁড়াশি অভিযান চালানোর পরও বছরের পর বছর কেন অবৈধ ইটভাটা গড়ে তোলার প্রবণতা বাড়ছে? দুর্বলতাটা আসলে কোথায়? অভিযানে অবৈধ ইটভাটা মালিকদের মনে কি কোনো ভীতি-আতঙ্কের সৃষ্টি হয়? নাকি তারা মনে করে, এ রকম অভিযান শুধু লোকদেখানো।

এবার আলোচনা করা যাক ইট-ক্রেতাদের নিয়ে। যখনই কোনো পণ্যের আনুষঙ্গিক খরচসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, স্বাভাবিকভাবেই সে পণ্যের বিক্রয় মূল্যও বেড়ে যায়। একইভাবে যখনই ইটভাটা মালিকদের নিয়মিত খরচের সঙ্গে এসব বাড়তি জরিমানা ও ক্ষয়ক্ষতির ধকল বহন করতে হয়, তখন তারা ইটের মূল্যও বাড়িয়ে দেয় ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য। এতে করে সেই অতিরিক্ত মূল্য বহন করতে হয় সাধারণ ক্রেতাদের এবং সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদারদের।

এবার মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি পরিকল্পনার অভাব, নাকি পরিকল্পনা করেই এ আর্থিক ক্ষতিগুলো করা হয়? সরকারি পর্যায় থেকে বারবার সরকারি অর্থের অপব্যবহার বা অপচয় বন্ধের কথা বলা হচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনের খরচ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পরও কেন এত অপচয়? এসব অপচয় বন্ধের কি কোনো সমাধান নেই? সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে-তাহলে কি এসব অভিযান বন্ধ করে দেওয়া উচিত? এর উত্তর হচ্ছে-না, বন্ধ করা উচিত নয়। বন্ধ করা উচিত অপরিকল্পিত নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম এবং অযথা অর্থ ও লোকবলের অপচয়। অভিযানগুলো যেন সুদূরপ্রসারী ও ফলপ্রসূ হয়, সঠিক নিয়মে প্রয়োগ করা হয়, অবৈধ কার্যক্রম চালানোর প্রবণতা যেন দিন দিন বৃদ্ধি না পায়, সেই সঙ্গে আরও কার্যকর কী কী পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত।

মো. মনিরুজ্জামান : সহকারী অধ্যাপক, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি anusandhan24.com'কে জানাতে ই-মেইল করুন- anusondhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

anusandhan24.com'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।



© ২০২৪ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। anusandhan24.com | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT